“সহিংস দৃশ্যমাধ্যম ও শিশুমন: প্রভাব গবেষণার আশি বছর” প্রবন্ধের রিভিউ

গণমাধ্যম আমাদের সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি অনুষঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন ও অগ্রগামী ভূমিকার ফলে গণমাধ্যমের রূপ পরিবর্তিত হচ্ছে। দৃশ্যমাধ্যম হিসেবে গণমাধ্যমের আঙিনায় যাত্রা শুরু করে টেলিভিশন।

১৯৩০ এর দশকে চলচ্চিত্র ও ১৯৫০ এর দশকে এর কাছাকাছি সময়ে টেলিভিশনের উত্থানকালের শুরু থেকেই মানসিক স্বাস্থ্যবিদ, গবেষক ও গণমাধ্যম বিষয়ক গবেষকগণ শিশুদের দৈনন্দিন জীবনে টেলিভিশন কীভাবে ভূমিকা রাখছে, শিশুদের মূল্যবোধ, বিশ্বাস এবং আচরণের উপর কতোটুকু প্রভাব ফেলছে, সেই বিষয়টি খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছেন।

প্রদত্ত প্রবন্ধে ড. কাবেরী গায়েন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের সহিংস আধেয়/মাধ্যম নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার একটি সবিস্তার বর্ণনা দিয়েছেন। আমার এই লেখায় ‘সহিংস দৃশ্যমাধ্যম ও শিশুমন: প্রভাব গবেষণার আশি বছর’ এর উপর ভিত্তি করে ব্যক্তিগত ভাবনা, উপলব্ধি, মতামত তুলে ধরছি।

টেলিভিশনকে দৃশ্যমাধ্যম বলা হচ্ছে এজন্য যে, গণমাধ্যমের এই শাখাটি দৃশ্যনির্ভর আধেয় নিয়ে কাজ করে। টেলিভিশনে দেখানো সহিংস আধেয় শিশুমনে প্রভাব ফেলছে। বিষয়টিতে প্রায় সবাই একমত হলেও সহিংস আধেয় কর্তৃক যে প্রভাব তৈরী হচ্ছে, সেটির ধরণ, মাত্রা ইত্যাদি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।

১৯৩০ থেকে ১৯৫০ এর দশক থেকে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের প্রভাব নির্ণয়ের জন্য গবেষণা শুরু হয়। গবেষণার ক্ষেত্রে প্রধানত ২ টি ধরণ বা মতবিশ্বাস দেখতে পাই।

  • ১. পরীক্ষণমূলক গবেষণা
  • ২. অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবক নির্ভর গবেষণা।

প্রথম ধরণে সুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে গবেষণা করা হয়। এই ধারার গবেষকগণ মনে করেন, শিশুরা টেলিভিশন বা কোন দৃশ্যমাধ্যমে যতো বেশি সহিংস আধেয় গ্রহণ করবে ততো বেশি তারা আগ্রাসী মনোভাবের হয়ে উঠবে। (বান্দুরা ও ওয়ালটারস ১৯৬৩; ও বারকোইজ ১৯৬৬)। দ্বিতীয় ধারায় মনে করা হয়, সরাসরি দৃশ্যমাধ্যমের আধেয়’র চেয়ে বরং শিশুদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান ও পরিবেশের প্রভাব এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৮০ এর দশকে শুরু হওয়া একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যে শিশুরা প্রাথমিক স্কুলে পড়ার সময় টেলিভিশনে অনেক সহিংস আধেয় দেখেছে, কিশোর বয়সে তাদের মধ্যে অন্যদের তুলনায় আক্রমণাত্মক ও আগ্রসী মনোভাবের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। (এল লরেল হোয়েসম্যান ও লিওনার্দ ইরন, ১৯৮৬)।

সহিংস দৃশ্যমাধ্যমের আধেয়’র স্বল্পমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রয়েছে। স্বল্পমেয়াদী প্রভাবগুলো মূলত ইন্ধন বা অবচেতন সক্রিয়তা, উত্তেজনা ও নির্দিষ্ট আচরণের অনুকরণ – এই ধাপগুলোতে হয়ে থাকে।

দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবগুলো দীর্ঘস্থায়ী পর্যবেক্ষণমূলক শিক্ষা ও মানসিক প্রক্রিয়াগুলোর সক্রিয়করণ এবং সংবেদনশীলতাকে ভিত্তি করে হয়ে থাকে। দৃশ্যমাধ্যমে সহিংসতা প্রচার নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বাস্তবতাকে তুলে ধরা, ক্যাথার্সিস ধারণা, সুররিয়ালিজমসহ আরো বিভিন্ন যুক্তিতে সহিংস আধেয় দৃশ্যমাধ্যমে উঠে আসছে।

সময়ের সাথে সাথে দৃশ্যমাধ্যমের রকম পাল্টে যাচ্ছে। আমি মনে করি, শিশুদের দৈনন্দিন জীবন, মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও আচরণের দৃশ্যমাধ্যম দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে থাকে। আপাতদৃষ্টিতে হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে এই প্রভাবণের বিষয়টিকে।

কিন্তু, আসলে বিষয়টি সাধারণ নয়। একজন শিশু তার সামাজিকীকরণের সময়ে যেসকল আধেয় গ্রহণ করে সেগুলো শিশুটির মানসিক গড়ন নির্মাণের উপাদান হয়ে উঠে।

এক্ষেত্রে আমি বহু-শ্রেণী-চলক ভিত্তিক ভাবনায় বিশ্বাসী। শুধুমাত্র সহিংস আধেয় একজন শিশুর মানসিক গড়নে ছাঁপ ফেলার ক্ষেত্রে কিংবা তাকে আগ্রাসী করে তুলতে যথেষ্ট নয়। বরং, শিশুটির সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও অবস্থান তার আধেয়গ্রহণ পরবর্তী সময়ের আচরণের বহিঃপ্রকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

প্রদত্তে প্রবন্ধে সীমিত আকারে ভিডিও গেমসের কথা উঠে এসেছে। টেলিভিশন ও বর্তমানে প্রচলিত অন্যান্য দৃশ্যমাধ্যমের মধ্যে সহিংস আধেয়’র ব্যবহার এখানে অনেক বেশি। সহিংস ভিডিও গেমস ব্যবহারকারীর আগ্রাসী আচরণ, আক্রমণাত্মক জ্ঞান ও সহিংস মনোভাব বৃদ্ধি করে। এবং সহানুভূতি এবং সামাজিক সহমর্মিতামূলক আচরণ হ্রাস করে।

ড.কাবেরী গায়েনের প্রবন্ধে যেসকল গবেষণা, মতামত ও আলোচনা-সমালোচনা উল্লেখ করা হয়েছে সেসকল অনুষঙ্গে একটি বিষয় আমার কাছে অনুপস্থিত মনে হয়েছে। কোন তত্ত্ব বা গবেষণার ভিত্তিতে কোন ধরণের কার্যকর নীতিমালা কোথাও সুষম পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের উদাহরণ আমার চোখে পড়ে নি। ‘সহিংস গণমাধ্যম গবেষণার বন্টন খুবই অসমভাবে হয়েছে পৃথিবীতে’ (ভন ফিলিটজেন, ১৯৮৮:৪৭)।

উত্তর আমেরিকা, পশ্চিম ইউরোপ, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ আরো গুটিকয়েক দেশে দৃশ্যমাধ্যমের সহিংস আধেয় নিয়ে গবেষণা ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, সহিংস আধেয় সারা পৃথিবীর দৃশ্যমাধ্যমগুলোতে ব্যপক হারে প্রচার ও প্রকাশিত হলেও এই বিষয়ে ভাবনার অবকাশ আছে খুবই ক্ষুদ্র একটি অংশের।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের দৃশ্যনির্ভর মাধ্যমে (এখানে টেলিভিশন অর্থে) সহিংস আধেয় কিংবা শিশুদের জন্য আধেয় বিষয়ক কোন নীতিমালা নেই। ফলে এর প্রভাব আমাদের সামাজিক অবকাঠামোতে কীভাবে পড়ছে, সেটি নির্ণয়ের কোন নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি নেই।

মুনফানির্ভর গণমাধ্যম সংস্কৃতির এই সময়ে সহিংস ও শিশুদের অনুপযোগী আধেয় নিয়ন্ত্রণের কোন নীতিমালা প্রণীত হলেও সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, এই ব্যপারে আমি আশাবাদী নই। বরং নীতিমালার পাশাপাশি দৃশ্যমাধ্যমে সহিংস আধেয়’র প্রভাব বিস্তারে বাঁধা হতে পারে, মনস্তাত্ত্বিক বিচারে উত্তীর্ণ সহিংসতা বিরোধী আধেয় (counter content) প্রচার করা যেতে পারে।

ইন্টারনেট ও উন্মুক্ত আধেয় যেখানে পরস্পরকে এগিয়ে নিচ্ছে, তখন আধেয় নিয়ন্ত্রণ আসলে সম্ভব নয়। আবার, এই নিয়ন্ত্রণ (censorship) কখনো অনায্য হয়ে উঠতে পারে। সেটিও কাম্য নয়। তাই, দৃশ্যমাধ্যমে সহিংসতার ভিন্ন মেরুর আধেয় প্রচারে গুরুত্ব দেয়া হলে বিষয়টি অধিকতর কার্যকর হতে পারে।

মন্তব্য করুন

error: ধন্যবাদ আপনাকে, কপি করতে চাওয়ার জন্য!