দ্য গ্র্যান্ড বুদাপেস্ট হোটেল: মিজ-আঁ-সিঁ নির্ভর বিশ্লেষণ

দ্য গ্র্যান্ড বুদাপেস্ট হোটেল। সিনেমাটি নির্মান করেছেন ওয়েজলি ওয়েল্‌স অ্যান্ডারসন। এই মার্কিন চলচ্চিত্র পরিচালক তার নাটকীয় দৃশ্যায়ন ও অনন্য বর্ণনাশৈলীর মাধ্যমে চলচ্চিত্র নির্মানের নিজস্ব একটি স্টাইল তৈরী করে নিয়েছেন। অ্যান্ডারসন গ্র্যান্ড বুদাপেস্ট সিনেমার গল্প বলতে মিজ-আঁ-সিঁ টেকনিকের সাহায্য নিয়েছেন।

Mise-en-scène/মিজ-আঁ-সিঁ – সিনেমার দৃশ্য এবং মঞ্চে উপস্থাপিত বিভিন্ন অনুষঙ্গ ও এদের সম্মিলিত বৈশিষ্ট্যগুলির একধরণের বিন্যাস। বলা হয়ে থাকে, “স্ক্রিনে যা দেখছেন সবই” মিজ-আঁ-সিঁ। চলচ্চিত্র ভাষার অন্যতম প্রধান উপাদান, মিজ-আঁ-সিঁ শব্দটি ক্যামেরার সামনে থাকা সেট-ডিজাইন, লাইটিং, প্রপস এবং অভিনেতাসহ সবকিছুকে শামিল করে।

ইনটেন্স থিম কালার, পপ সঙ্গীতের ব্যবহার, ডেডপ্যান টোন, আনসার্টেন মেলানকলি কিংবা অনিশ্চিত বিষণ্নতা, প্রপসের অতিবহুল প্রয়োগ, ফ্রেমের প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশকে সর্বোচ্চ সার্থকতায় ব্যবহার করা, ইত্যাদি অ্যান্ডরসনীয় ফুটপ্রিন্ট- দ্য গ্র্যান্ড বুদাপেস্ট হোটেল সিনেমাটিতে আমরা দেখতে পাই।

Mise-en-scène এর উপাদান ও গ্র্যান্ড বুদাপেস্ট সিনেমা বিশ্লেষণ

মিজ-আঁ-সিঁ এর মূল উপাদান হিসেবে ২ টি বিষয় বিবেচনায় রাখছি। ডিজাইন ও কম্পোজিশন। বিশ্লেষণের সুবিধার্থে উপাদানগুলোকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করি: সেটিংস, লাইটিং ও কালার, কস্টিউম, মেকআপ, প্রপস, ক্যারেক্টার, শট কম্পোজিশন ইত্যাদি।

সেটিংস

মিজ-আঁ-সিঁ তৈরির ক্ষেত্রে সেটিং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সামঞ্জস্যপূর্ণ কিংবা বিপরীতধর্মী ব্যাকগ্রাউন্ড, ফ্রেমযুক্ত কোন ছবি, কোন ট্রফি কিংবা দেয়ালে ঝোলানো সার্টিফিকেট, একটি প্রাচীন ঘড়ি, পুরনো আসবাব হয়ে উঠে সেটিংসের অংশ। হুইস্কির একটি গ্লাস, সিগারেটের প্যাকেট, ডিরেকশন বোর্ড ইত্যাদি অনুষঙ্গগুলো সাধারণ দৃষ্টিতে কোন সিগনিফিকেন্ট বা বিশেষ কোন গুরুত্ব বহন করে না। কিন্তু, একসাথে এই প্রপসগুলো হয়ে উঠে একটি বিস্তারিত সেটিংসের অংশ।

সিনেমার মূলগল্প শুরুর সময়, দ্য গ্র্যান্ড বুদাপেস্ট হোটেল এর ইউরোপীয় অবকাঠামোর হাতে-আঁকা সাবমিসিভ কালারের ভিনটেজ ছবিতে দেখানো পাহাড়ের উপরে পাথরের দুর্গ, পাহাড়ের শরীর বেঁয়ে উঠে যাওয়া বক্সকার রোড, কালারফুল রিসিপশন, চোখ-ধাঁধানো গ্র্যান্ড হল, বিশাল কারুকাজসম্পন্ন গ্র্যান্ড হোটেলের অবস্থান ছাঁপিয়ে যেতে চায় কল্পনাকে।

কিন্তু, সেটিংসের সকল অংশের সমন্বয়ে দেখানো অবাস্তব চিত্রের মধ্যেও বাস্তবতা এখানে বিদ্যমান। সিনেমায় দেখানো দ্য গ্র্যান্ড বুদাপেস্ট হোটেলটি শহরের পরিত্যক্ত অ্যাপার্টমেন্ট স্টোরগুলির একটি থেকে তৈরি করা হয়েছিল।

সিনেমার প্রধান চরিত্র- গুস্তাভ এবং জিরো আমাদের প্রধান ফোকাস থাকলেও সিনেমার প্রতিটি সিনজুড়ে আমাদের দৃষ্টিকে অনুসন্ধানী করে তুলেছেন অ্যান্ডারসন। এভাবেই দ্য গ্র্যান্ড বুদাপেস্ট হোটেল নিজেই একটি চরিত্র হয়ে অ্যান্ডারসনের গল্পে অংশ নেয়।

লাইটিং ও কালার

দ্য গ্র্যান্ড বুদাপেস্ট হোটেল এর প্রতিটি সিন, সিকোয়েন্সে রঙের বিস্ফোরণ ঘটতে দেখি। হাই-কী লাইটিং ব্যবহার করা হলেও হালকা গোলাপী, গভীর লাল এবং বেগুনির মতো উজ্জ্বল, মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম রঙের ব্যবহার, একটি পরিপূর্ণ এবং অভিব্যক্তিপূর্ণ সিনেমা তৈরীতে অনুঘটক হিসাবে কাজ করছে।

সিনেমায় সময়ের ভিন্নতা বুঝাতে পরিচালক কালার কোডের সাহায্য নিয়েছেন। ১৯৩০ এর দশক বুঝাতে হালকা গোলাপী, গভীর লাল এবং বেগুনি, ১৯৬০ এর দশক বুঝাতে হলুদ, স্বর্ণ এবং সবুজ – সেইসাথে ১৯৮০ থেকে বর্তমান সময় বুঝাতে ট্র্যাডিশনাল কালার টোন ব্যবহার করেছেন।

কস্টিউম, মেকআপ, প্রপস

চলচ্চিত্রে পোশাকের ডিজাইন করা হয় অভিনেতাকে সুন্দর দেখানোর জন্য নয়। বরং, একটি চরিত্রকে একজন অভিনেতা কতোটুকু ফুঁটিয়ে তুলতে পারেন তার সহযোগি হিসেবে কাজ করে কস্টিউম, মেকআপ। এটি সেটিং এবং চলচ্চিত্রের সামগ্রিক রূপের সাথে ব্লেন্ড বা মিশে গিয়ে স্বার্থক অবস্থান রেখে যায়।

দ্য গ্র্যান্ড বুদাপেস্ট হোটেল সিনেমায় গুস্তাভ ও জিরোর পোশাকের ধরণ, অন্য চরিত্রদের পোশাক, সাথে ব্যবহৃত বিভিন্ন ইনস্ট্রুমেন্টাল প্রপস, রূপকধর্মী উপকরণ, সংস্কৃতিক সরঞ্জামাদি চলচ্চিত্রটিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

ক্যারেক্টার

গ্র্যান্ড বুদাপেস্ট হোটেল এর ক্যারেক্টারেরা সময়ের বাইরে থেকে এসেছে বলে মনে হয়। কমেডিয়ান হতে হতে তারা যেনো কেমন মেলোড্রামাটিক হয়ে উঠে। বিব্রতকর কমোডির মধ্যে কোথায় যেনো ক্যারেক্টারেরা খুঁজে বেড়ায় নিজেদের রূট। জিরো কিংবা গুস্তাভের মতো অন্য চরিত্ররা নিজেদের মধ্যে আলাদা একটা জগত তৈরী করে রেখেছে।

সহজ ও সাধারণ চত্রিগুলোকে ডি-ন্যাচারালাইজ করে উপস্থাপিত হয়েছে সিনেমাতে। যেনো চরিত্রগুলোর এক্সিটেন্স থেকে তাদের সাসটেইনেবিলিটি- সবটুকুতেই অতিরঞ্জিত বা কৃত্রিমতা প্রদর্শিত হয়ে নতুন আরেকটা সিনেমা ল্যাঙ্গুয়েজ তৈরী হচ্ছে। চোখের সামনে তৈরী থাকা মিজ-আঁ-সিঁ হয়ে উঠছে কল্পনার ক্যানভাসে আঁকা ভাবলেশহীন একটি বেদনাদায়ক মেলোড্রামা।

শট কম্পোজিশন

সেটিং, লাইটিং, ক্যারেক্টার, ন্যারাটিভের মতো শট কম্পোজিশন মিজ-আঁ-সিঁ এর একটি কার্যকর উপাদান। অ্যান্ডারসন ব্যক্তিগতভাবে সিমেট্রিক্যাল ও সেন্টার্ড লাইন কম্পোজিশনে কাজ করতেন। দ্য গ্র্যান্ড বুদাপেস্ট হোটেল সিনেমাটিতেও এর ব্যতিক্রম ছিলো না। ছোট ছোট শটে ভেঙে গল্প বলেছেন অ্যান্ডারসন। যেখানে ফ্রেমগুলো বাচ্চাদের খেলনার বাক্সের মতো বাক্সে বাক্সে বন্দি করে রাখা বলে মনে হয়েছে।

অ্যান্ডারসনের সিনেমা, সামঞ্জস্যপূর্ণ উপাদানের আপাত অগোছালো নির্মাণ-বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। প্যারালাল কাটিং, সিমেট্রিক ও সেন্টার্ড এলাইনড কম্পোজিশন, অত্যুজ্বল কালার, ট্র্যাকিং শট, অতিবাস্তব ছবিরমতো দৃশ্য ইত্যাদি বিষয়ের দক্ষ ব্যবহার- দ্য গ্র্যান্ড বুদাপেস্ট হোটেল সিনেমাটিকে একটি দারুন সিনেমাটিক জার্ণিতে পরিণত করেছে।

মন্তব্য করুন

error: ধন্যবাদ আপনাকে, কপি করতে চাওয়ার জন্য!