বাংলাদেশে পরিবেশ সাংবাদিকতার বর্তমান হালচাল

পরিবেশ হচ্ছে এমন একটি অনুষঙ্গ, পরিস্থিতি, বস্তু বা অবস্থা যার মধ্যে আমরা আছি। অন্যভাবে বললে আমাদের ঘিরে থাকা চারপাশের সবকিছু মিলেই পরিবেশ। গাঙ্গেয় বদ্বীপের ভূপ্রকৃতিগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের পরিবেশ-প্রকৃতির উপর নির্ভর করে আমাদের জীবন ও জীবিকা। বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভাবনার উপর প্রভাব বিস্তারকারী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে পরিবেশ।

পৃথিবীর সামগ্রিক পরিবেশের ব্যপক ঋণাত্মক পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী পরিবেশগত সমস্যার পরিমান ও ক্ষতির পরিধি ধীরে ধীরে বাড়ছে। টাইফুন, হারিকেন, সাইক্লোনসহ দূষণ, বন্যা, ভূমিধস, খরা ইত্যাদি নানান ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে, কাম্য না হওয়া সত্ত্বেও পরিচিতি বাড়ছে আমাদের।

এইসব বিষয় ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল ধরণের সংবাদ ও ঘটনার উপর ক্রমাগত মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। সংবাদ পাঠকদের একটি অংশ জানতে চায় তাদের চারপাশের পরিবেশ কেমন থাকছে। এই জানার প্রয়োজন পূরণ করতে সৃষ্টি হয়েছে বিষয়ভিত্তিক সাংবাদিকতার একটি শাখা, পরিবেশ সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতা অধ্যয়নের বিস্তৃত ক্ষেত্রে পরিবেশগত সাংবাদিকতা একটি ক্রমবর্ধমান উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র।

পরিবেশগত সাংবাদিকতাকে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে এভাবে যে, “যে ধারার সাংবাদিকতা, চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কিত বর্তমান ঘটনা, ঘটনার প্রবণতা, সমস্যা এবং পরিবেশ ও মানুষের সাথে সম্পর্কিত তথ্যের সংগ্রহ, যাচাইকরণ, উৎপাদন, বিতরণ এবং প্রদর্শন করে। এবং, দিনশেষে পরিবেশ সম্পর্কে পাঠকের জানার তৃষ্ণা মেটাতে সাহায্য করে।”

এটি রাজনীতি, বিজ্ঞান, ব্যবসা, সংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক বিশ্বের বিভিন্ন অনুষঙ্গগুসমূহকে সংযুক্ত করে। স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক পরিমন্ডলজুড়ে জানার বিষয় অন্বেষণ করে এই জাতীয় সাংবাদিকতা। প্রধান পরিবেশগত সমস্যা যেমন বন উজাড়, পরিবেশ দূষণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি পরিবেশের বিকাশের সাথে সম্পর্কিত।

বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই দেশের জনগোষ্ঠীর একটি বিপুল অংশের জীবন জীবিকাকে প্রভাবিত করে দুর্যোগ। দুর্যোগ-পূর্ব সময়ে গণমাধ্যম দুর্যোগ প্রস্তুতি সম্পর্কে মানুষকে তথ্য দেয়া, দুর্যোগ শুরুর আগে এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতি প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি, দুর্যোগকালীন পরিস্থিতি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য প্রদান ইত্যাদি অবস্থানে ভূমিকা রাখে পরিবেশ সাংবাদিকতা।

পরিবেশ সাংবাদিকতার উদাহরণ হিসেবে আমাদের সচরাচর এই জাতীয় সংবাদ প্রচারকেই সামনে দেখে থাকি। কিন্তু, পরিবেশ সাংবাদিকতার পরিধি মোটেও এমন নয়। বরং, এর সীমানা বৃহৎ।

নতুন শতকের প্রযুক্তিনির্ভর সবুজ বিপ্লবের সুবিধা-সমস্যা, উফশী বীজ, বিটি বেগুণ, ইউক্যালিপ্টাসের বনায়ন, সার-কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, দেশীয় ধানের নানা জাতের হারিয়ে যাওয়া, হালদা নদীতে মাছের প্রজনন, পাহাড় দূষণ আর পাহাড় কাটা সবকিছুই বাংলাদেশের পরিবেশ সাংবাদিকতার আওতায় পড়ে।

নিমতলী ট্র্যাজেডি, বুড়িগঙ্গার পানির রঙ, হাজারিবাগের ট্যানারির বর্জ্য, গার্মেন্টসের কাপড়ধোয়া ক্যামিক্যালগন্ধী রঙিন পানিও পরিবেশ সাংবাদিকতার অংশ।

বাংলাদেশে পরিবেশ নিয়ে সুনির্বাচিত ও তথ্যবহুল অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করা সাংবাদিকতার অন্যতম বিপজ্জনক কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক দশকে, পরিবেশগত বিষয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের  তাদের কাজের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে হত্যা বা হত্যার হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। সহিংসতা, হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মিথ্যা মামলা শিকার হয়েছে অনেক সাংবাদিক।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মেঘনা নদীবেষ্টিত সোনারগাঁওয়ের নুনেরটেক নামের একটি চরের কথা। এই চরের চারপাশ থেকে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় চরের অবস্থান নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছিলো। বালু-সন্ত্রাসের কারণে বিপন্ন হয়ে পড়ে চরের ভূগঠন ও জনজীবন।

তখন গণমাধ্যমে সংবাদ ছাঁপা হওয়ার প্রেক্ষিতে চাপের মুখে ড্রেজিং বন্ধ রাখে প্রভাবশালী গ্রুপ। কিন্তু, হামলা হয় সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের উপর।

বান্দরবানের পাহাড় থেকে পাথর কেটে পাচার, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছ উজাড়, ইজারা নিয়ে রাতারাতি পাহাড়ের মালিক বনে যাওয়া, গাজীপুরে একরের পর একর গজারী বন ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করার মতো আরো নানান অন্যায়ের বিরুদ্ধে যখন যেখানে সাংবাদিকরা সংবাদ তৈরী করছেন, প্রচার করছেন, সেখানেই তাদের চুপ করিয়ে দেয়া হচ্ছে।

২০১৮ নড়াইলের নবগঙ্গা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের কাছে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনসহ নদী ভাঙনের দৃশ্যধারণ করায় সাথে এক সাংবাদিককে কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম করেছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীরা।

২০২০ সালে দিনাজপুরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করার সংবাদ সংগ্রহ করার সময় হামলার শিকার হন স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিক। ২০২১ সালে এসেও এই অবস্থার উন্নতি হয় নি। যশোরের বেনাপোলে অবৈধভাবে ফসলী জমি ধ্বংস করে মাটি ও বালু উত্তোলনকারী ভূমিদস্যুগোষ্ঠীর আক্রমণে স্থানীয় সাংবাদিকরা লাঞ্চিত হয়েছেন।

এখানে প্রসঙ্গত একটি উদাহরণ আনা যেতে পারে। ভারতে বালু উত্তোলন ব্যবসার সাথে স্থানীয় এক মন্ত্রীর সম্পৃক্ততা নিয়ে রিপোর্ট করেছিলেন সাংবাদিক জগেন্দ্র সিং। ২০১৫ সালে তিনি আগুনে পুড়ে মারা যান। চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই তিনি অভিযোগ করেন, ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।

১৯৮৩ সাল থেকে বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরাম (এফইজেবি) তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু, ক্ষমতাসীনদের পরিবেশ সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি, পরিবেশগত অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো বিপজ্জনক বিষয়ে অনুসন্ধান ও সংবাদ তৈরী ও প্রকাশের পরবর্তীতে যেসকল জটিলতা আসে, সেসব ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের সহায়ক অভিভাবক বা সাপোর্টারের স্থানে আসতে পারে নি এফইজেবি।

২০১১/১২ এর দিকে ক্লাইমেট কম্যুনিকেটরস ফোরাম অব বাংলাদেশ বা সিসিএফবি নামে একটি পরিবেশ সাংবাদিকতা বিষয়ক সংগঠন কাজ শুরু করে। এফইজেবির মতো এই সংগঠনটিরও বিশেষ কোন ভূমিকা দেখা যায় নি কার্যক্ষেত্রে। এছাড়া কিছু পরিবেশ সংশ্লিষ্ট এনজিও পরিবেশের সাথে সম্পৃক্ত বিষয় নিয়ে কাজ করে। তাদের পক্ষ থেকে পরিবেশ সাংবাদিকতার কিছু কিছু ক্ষেত্রে সহায়তা করার প্রবণতা দেখা যায়।

তৃণমূলে কাজ করার সহায়ক হিসেবে এই পারস্পরিক তথ্য-উপাত্ত, রিসোর্সেস আদান-প্রদানে সমঝোতা গড়ে উঠেছে নিজেদের মধ্যে। কিন্তু, সম্পূর্ণভাবে পরিবেশ সাংবাদিকতা নিয়ে কাজ করে এমন কোন সরকারি, বেসরকারি গ্রুপ কিংবা প্রতিষ্ঠান দেখা যায় নি বাংলাদেশে।

বাংলাদেশের প্রচলিত গণমাধ্যমে প্রকাশিত, প্রচারিত আধেয়র দিকে এবার নজর দেয়া যায়। প্রকাশিত কাগজের দৈনিকের মধ্যে ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, নিউ এইজ- এই পত্রিকাগুলোতে প্রায় নিয়মিত পরিবেশ বিষয়ক সংবাদ প্রকাশিত হতে দেখা যায়।

ডেইলি স্টার উন্নয়ন সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবেশ বিষয়ক সংবাদ প্রকাশ করে থাকে। ফলে, জলবায়ূ, এর প্রভাব, বিভিন্ন পরিবেশগত সমস্যার প্রভাব ইত্যাদি নিয়ে তারা কাজ করে। প্রথম আলো চেষ্টা করে নিউট্রাল টোনে সংবাদ প্রকাশ করতে। নিউ এইজ পত্রিকার পরিবেশ বিষয়ক রিপোর্টে খানিকটা যত্নের ছাঁপ আনার চেষ্টা নজরে পড়ে। বাংলাদেশ প্রতিদিন সাধারণত পরিবেশের দূষণ বিষয়ক সংবাদ নিয়ে কাজ করে।

আমাদের টেলিভিশনের আধেয় তালিকায় পরিবেশ সাংবাদিকতা কিংবা পরিবেশনির্ভর আধেয় খুবই সীমিত। সরকারি মালিকানার টেলিভিশনে দায়সারা গোছের কিছু আধেয় নিয়মিত প্রচারিত হয়। বেসরকারি টেলিভিশনগুলোতে এর সংখ্যা আরো কম। বহুল প্রচারিত অনুষ্ঠানের নাম বললে চ্যানেল আইয়ের মাটি ও মানুষ নামের প্রোগ্রামটির কথা উঠে আসে।

মুনাফানির্ভর নগরকেন্দ্রীক মনোভাব ও রুচির কারণে বাংলাদেশের প্রচলিত গণমাধ্যমগুলোতে পরিবেশ সাংবাদিকতার অবস্থান এখনো শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড়ায় নি। একইসাথে মিডিয়ার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের বিষয়টি বিচেনায় রাখতে হবে। প্রচলিত গণমাধ্যমের চেয়ে পরিবেশ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অনেকাংশে স্যোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্যে চালিত ‘নাগরিক সাংবাদিকতা’ অধিকতর গতিশীল ভূমিকা পালন করে থাকে।

বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতিগত অবস্থান ও এর পরিবেশগত অবস্থার কারণেই এখানে পরিবেশ সাংবাদিকতার সঠিক ও সুষমমাত্রার বিকাশ অতীব প্রয়োজনীয়। মানুষ হিসেবে টিকে থাকার দায়বদ্ধতা থেকে গণমাধ্যমে পরিবেশ সাংবাদিকতার আধেয় ও সম্প্রচার সময়ের সীমানা বৃদ্ধি করতে হবে।

দেশ ও নিজেদের রক্ষার পাশাপাশি জীবনধারণের সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য পরিবেশ সাংবাদিকতার সম্প্রসারণের কোন বিকল্প নেই।

 

 

রেফারেন্সঃ

  1. Rahmatullah, M., Prodhan, M.T., Islam, M., & Hossain, M.S. (2021). Coverage of Environmental Issues in Local Newspaper: an Analysis on Two Dailies of Rangpur, Bangladesh.International Multidisciplinary Research Journal, 1-6.
  2. Ferdous, S., & Khatun, M. (2020). News Coverage on Environmental Issues: A Study on Print Media of Bangladesh.
  3. Global Investigative Journalism Network. (2021). জলবায়ু সংকট: অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জন্য আইডিয়া. https://cutt.ly/1QV5FaU
  4. প্রতিবেদকনিজস্ব. (n.d.).এবিএম মূসা: পরিবেশ সাংবাদিকতার এক পথিকৃৎ. Prothomalo. Retrieved August 17, 2021, from https://cutt.ly/tQV5X8X
  5. http://www.gag.it, G. A. G. (n.d.). The role of environmental journalism in climate change – BCFN Foundation. Retrieved August 17, 2021, from www.barillacfn.com website: https://www.barillacfn.com/en/magazine/food-and-society/the-role-of-environmental-journalism-in-climate-change/

মন্তব্য করুন

error: ধন্যবাদ আপনাকে, কপি করতে চাওয়ার জন্য!