কলাবাগানে ও-লেভেল শিক্ষার্থীর ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রকাশিত সংবাদ রিভিউ

০৭ জানুয়ারি ২০২১ ঢাকায় একজন স্কুল শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। ঘটনাটি প্রকাশের পর থেকে দেশজুড়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা বাদী হয়ে কলাবাগান থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে থেকে জানা যায়, ঘটনার দিন সকাল আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর মা কর্মস্থলের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয়ে যান। এর এক ঘণ্টা পরে তার বাবাও ব্যবসায়িক কাজে বাসা থেকে বের হয়ে যান।

দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ওই শিক্ষার্থী তার মাকে ফোন করে কোচিং থেকে পড়ালেখার পেপার্স আনার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। এই মামলার একমাত্র আসামি ‘ও-লেভেল পড়ুয়া শিক্ষার্থী দুপুর আনুমানিক ১টা ১৮ মিনিটে ফোন করে ওই শিক্ষার্থীর মাকে জানান, মেয়েটি তার বাসায় গিয়েছিলেন। হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়ায় তাকে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়েছে। অফিস থেকে বের হয়ে আনুমানিক দুপুর ১টা ৫২ মিনিটে শিক্ষার্থীর মা হাসপাতালে পৌঁছেন।

হাসপাতালের কর্মচারীদের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, আসামি তার কলাবাগান ডলফিন গলির বাসায় ডেকে নিয়ে মেয়েটিকে ধর্ষণ করেন। রক্তক্ষরণের কারণে অচেতন হয়ে পড়লে বিষয়টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আসামি নিজেই তাকে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে নিয়ে যান। কলাবাগান থানা পুলিশের একটি দল হাসপাতালে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়।

ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানান ধরণের সংবাদ ও আঙ্গিকে উঠে আসতে দেখেছি। দেশের প্রচলিত গণমাধ্যমসমূহ বিভিন্নভাবে এই বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করেছে। একজন সংবাদ-সচেতন নাগরিক হিসেবে বেশকিছু মাধ্যমের সংবাদ পড়েছি। রিপোর্টার হিসেবে আমি বিষয়ে কিভাবে সংবাদটি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরী করতাম কিংবা সেখানে সাংবাদিকতার নীতি কিভাবে অনুসরণ করা উচিত- বিষয়গুলো আমাকে ভাবিয়েছে।

প্রকাশিত সংবাদগুলোতে আমি কী ধরণের ভালো-মন্দ, সামঞ্জস্য-অসমাঞ্জস্য লক্ষ্য করেছি, ৫টি প্রকাশিত সংবাদের আলোকে সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

১। “ইংরেজি মিডিয়ামের ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ, ৪ বন্ধু আটক” ( প্রথম আলো, ০৮ জানুয়ারি ২০২১)

সংবাদটির শিরোনামটি প্রথমেই আমাকে অবাক করেছে। একজন শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগের মতো ঘটনার শিরোনাম শুরু হয়েছে ইংরেজি মিডিয়াম শব্দগুচ্ছ দিয়ে। আমার দৃষ্টিতে এটিকে অপ্রয়োজনীয় ও অহেতুক মনে হয়েছে। কারণ, ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটানোর সাথে কোন শিক্ষা-মাধ্যমের কোন সংশ্লিষ্টতা থাকার সুযোগ নেই। ব্যপারটি মোটেও এমন নয় যে, ইংরেজি মিডিয়ামের ছাত্রীকে ধর্ষণ করে হত্যা আলাদা মনোযোগের দাবী রাখে কিংবা এটা কম অথবা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বরং, এখানে ইংরেজি মিডিয়াম শব্দটির উল্লেখ অনেকক্ষেত্রেই মূল ঘটনার প্রতি মনোযোগ হ্রাস করেছে বলে মনে হয়েছে। সম্পূর্ণ নিউজটিকে পারস্পরিক সামঞ্জস্যতার দিক থেকে বিবেচনা করলে কিছুটা জটিল মনে হয়েছে। সংবাদটি পুরো পাঠ করার পর একজন পাঠক আসলে বুঝে উঠতে পারবেন না, ঘটনার মূল উপসংহার কেমন।

২। “বন্ধুর বাসায় স্কুলছাত্রীর মৃত্যু, ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ” ( জাগো নিউজ, ০৮ জানুয়ারি ২০২১)

বন্ধুর বাসায় মৃত্যু! সংবাদটির শিরোনামে আবারও আমার প্রশ্ন তৈরী হয়েছে। ব্যপারটি আসলে কি? বন্ধুর বাসায় মৃত্যু নাকি ধর্ষণের অভিযোগ? নাকি ভিক্টিমের মৃত্যু? শিরোনামের প্রশ্ন মনে রেখে সম্পূর্ণ সংবাদটির দিকে নজর দিতে চাই। নিউজের ইন্ট্রো/প্রথম ও দ্বিতীয় প্যারা পড়ার পরও বন্ধুর বাসায় মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে কোন ইংগিত নেই। সেখানে আমরা দেখি শুধু “আটকদের মধ্যে একজনের দাবি, ওই ছাত্রী তার পূর্বপরিচিত” এরকম একটি বাক্য।

পুরো সংবাদ পড়ে, শিরোনামে বন্ধু শব্দটিতে এভাবে অহেতুক গুরুত্ব আরোপের দরকার আদৌ ছিলো বলে মনে করি না।

৩। “ও লেভেলের ছাত্রীকে ‘ধর্ষণের পর হত্যা’, আটক ১” ( নিউজ বাংলা ২৪, ০৭ জানুয়ারি ২০২১)

ধর্ষণের পর হত্যার বিষয়টি ঘটনা প্রমাণের আগেই এই অনলাইন সংবাদমাধ্যমটি নিশ্চিত করছে! যদিও তারা কোটেশন চিহ্নের ব্যবহারের মাধ্যমে বিষয়টিতে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছে। সম্পূর্ণ সংবাদটি পাঠ করলে একটি সরল সংবাদ মনে হয়েছে। সেই তুলনায় শিরোনামটিকে যথার্থ মনে হয় নি। সংবাদে তথ্য ও পুলিশের বরাতে সহজভাবে বিষয়টিকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

৪। “রাজধানীতে দিনদুপুরে ধর্ষণের পর ‘ও’লেভেলের ছাত্রীর মৃত্যু, আটক ৪” ( ডেইলি বাংলাদেশ, ০৭ জানুয়ারি ২০২১)

আবারো সেই একই বিষয় প্রথমেই নজরে পড়েছে। দিনদুপুরে ধর্ষণের পর ছাত্রীর মৃত্যু। দিনদুপুরে ও ও লেভেল শব্দদুটো বিশেষ কোন ভূমিকা রেখে বলে মনে হয় নি। সংবাদের মূল অংশে পুলিশের একজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ‘দিহানের বাসায় এই ধর্ষণের ঘটনা ঘটে’ মূল বিষয়টি নিশ্চিতও করে দেয়া হচ্ছে। অথচ, ঘটনার সংবাদ প্রকাশের সময়ে কারো পক্ষেই তখনো মূল ঘটনাটি নিশ্চিত করে বলা সম্ভব ছিলো না।

৫। “ঢাকায় স্কুল শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে মামলা” ( বিবিসি বাংলা, ০৮ জানুয়ারি ২০২১)

বিবিসির প্রকাশিত এই সংবাদটি আমার কাছে তুলনামূলক ভালো লেগেছে। সম্পূর্ণ নিউজটি পাঠ করার পর তথ্যের উপচে পড়ার মতো কিছু নজরে পড়ে নি। অনেক বেশি উদ্ধৃতি কিংবা বরাত দিয়ে সংবাদকে ভারী করা হয় নি বলে মনে হয়েছে।

৫ টি সংবাদ নিয়ে আলাদা সংক্ষেপ আলোকপাত করলেও সামগ্রিকভাবে কিছু বিষয় উল্লেখ করা দরকার। সংবাদগুলোর শিরোনামগুলো প্রথমেই আলোচনা এসেছে। কারণ, শিরোনামগুলো শুরুতেই পাঠক হিসেবে আমার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। ঘটনার পরপরই প্রকাশিত এই ৫ টি সংবাদ ছাড়াও এই ঘটনা সংক্রান্ত পরবর্তীতে প্রকাশিত ফলোআপ সংবাদ পাঠ করা হয়েছে। সবখানে কিছু বিষয় খুব দৃষ্টিকটু লেগেছে।

ঘটনাটির উপসংহারে পৌঁছে যাওয়ার একধরণের তাড়াহুড়ো প্রায় সকল গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে দেখতে পেয়েছি। সংবাদস্টোরি গুলো বিচারকের লিখিত রায়ের চেহারা নিয়েছে। কিছু গণমাধ্যম এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সামাজিক অবক্ষয় দেখাতে চেয়েছে। কোন কোনটি দেশের বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে।

কোন কোন সংবাদ পড়ে মনে হয়েছে, অপরাধীর প্রমাণের আগেই অভিযুক্তকে অপারাধী সাব্যস্ত করে তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করা হয়েছে। ধর্ষিতা বা যৌন নিপীড়নের শিকার ব্যক্তি ও অপরাধী কিংবা অভিযুক্তের নাম-পরিচয়-অবস্থান প্রকাশ করা উচিত নয়, এই বিষয়টিও অনেক গণমাধ্যমই তোয়াক্কা করে নি।

মনে হয়েছে, সবাই কোন না কোন এজেন্ডা তুলে ধরছে। ধর্ষণের ঘটনাটি কেবলই একটি উপলক্ষ্য মাত্র। বাজারে পত্রিকার বিক্রি বাড়ানো বা টেলিভিশনের টিআরপি কিংবা অনলাইনের হিট বৃদ্ধির জন্য ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর এই সংবাদটি প্রকাশ ও প্রচারের ক্ষেত্রে সংবাদিকতা সাধারণ যে নীতিমালা আছে, সেসব নিয়ে অনেক গনমাধ্যমই দায়িত্বশীল আচরন করেনি বলে মনে হয়েছে। এখানেই আমার আপত্তি।

আমি সাংবাদিক অথবা সংবাদ মাধ্যমের পরিচালক হলে ঘটনাটিকে নির্মোহভাবে দেখানোর চেষ্টা করতাম। ফলোআপ নিউজে বলার চেষ্টা করতাম, কীভাবে আসলে ঘটনাটি ঘটেছে। কোন পূর্ব-অনুমান বা বিশ্বাস পোষণ করা ব্যতিত ঘটনাটিকে বাহুল্য এড়িয়ে, মানবিকতার মাত্রা বজায় রেখে তুলে ধরা যায় কিনা, সেটা ভাবার চেষ্টা করতাম।

সাংবাদিক হিসেবে হত্যার শিকার শিক্ষার্থী কিংবা অপরাধী ২ জনের অবস্থানে কোন পার্থক্য নেই। বিশেষ সহানুভূতি কিংবা বিশেষ ঘৃণা প্রকাশেরও সুযোগ নেই। বিষয়টি অভ্যাস করা সহজ না হলেও নির্মোহ থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টার কোন বিকল্প নেই।

মন্তব্য করুন

error: ধন্যবাদ আপনাকে, কপি করতে চাওয়ার জন্য!