সেমিওলজি কি? সেমিওলজির মাধ্যমে চলচ্চিত্র বিশ্লেষণের উদাহরণ

সেমিওলজি বা চিহ্নবিদ্যা হচ্ছে আমাদের চারপাশের নানান অনুষঙ্গে জড়িয়ে থাকা চিহ্নের অধ্যয়ন বা পাঠ বিষয়ক একটি অধ্যয়ন শাখা। সেমেনটিকস, সেমিওটিকস, সেমোলজি, সেমাসিওলজি এবং সেমোওলজি সবই গ্রীক শব্দ সেমাইনোর বিভিন্ন রূপ থেকে গঠিত হয়েছে। সেমোলজি একটি বিস্তৃত ক্ষেত্রকে বোঝায়।

সাধারণভাবে ব্যবহারিক আচরণের উপর নির্ভর করে চিহ্নের অধ্যয়নকে সেমিওলজি বলা হয়। এর মধ্যে শব্দ, চিত্র, অঙ্গভঙ্গি, অবজেক্টস, বাদ্যযন্ত্র এবং এগুলোর পারস্পরিক জটিল সংযোগগুলি অন্তর্ভুক্ত।

সেমিওলজিকে সাহিত্য তত্ত্বের ভিত্তি হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বিংশ শতাব্দীর অনেক অনন্য ও প্রথাবিরোধী তত্ত্ব যেমন স্ট্রাকচারালিজম অ্যান্ড পোস্টস্ট্রাকচারালিজম, স্ট্রাকচারাল নৃবিজ্ঞান (লেভি-স্ট্রাস), সাইকোঅ্যানালাইসিস (ল্যাকান), সাংস্কৃতিক স্টাডিজ (বার্থেস) এবং ফোকল্টের তত্ত্বগুলি সেমিওটিক্স থেকে ব্যপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।

সুইস ভাষাতত্ত্ববিদ ফার্দিনান্দ ডি সসুর সেমিওলজিকে সংজ্ঞায়িত করেন, “সমাজের মধ্যে প্রচলিত চিহ্নের জীবন” অধ্যয়ন হিসাবে। ১৭ শতকে শব্দটি ইংরেজ দার্শনিক জন লকের মাধ্যমে প্রথম শোনা যায়। তবে গবেষণার অন্তর্দ্বন্দ্বী ক্ষেত্র হিসাবে সেমিওটিক্স বা সেমিওলজির ধারণাটি ১৯ শতক ও ২০ শতকের প্রথমদিকে সসুর এবং আমেরিকান দার্শনিক চার্লস স্যান্ডার্স পিয়ার্স এর গবেষণাকর্মের মধ্য দিয়ে সকলের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যয়নের শাখা হিসেবে পরিচিত লাভ করে।

সেমিওলজি বলতে ভাষা বা শিল্পের ক্ষেত্রে চিহ্নের (সাইন) নির্মাণ, পদ্ধতিগত গঠন ও প্রয়োগের আলোচনা বোঝায়। সিগনিফায়ার (সূচক) ও সিগনিফায়েড (সূচিত) এই দুই অনুষঙ্গ মিলেই একটি চিহ্ন তৈরী হয়। চিহ্নগুলোকে নিজস্ব অর্থ প্রকাশ কিংবা বৈশিষ্টের কারণে তিন শ্রেণীত ভাগ করা হয়েছে।

  • ক. প্রতিমা (আইকন) – সিগনিফায়ার সাদৃশ্যযুক্ত বা অনুকরণকারী হিসাবে অনুভূত হয়
  • খ. সূচক (ইনডেক্স) – সিগনিফায়ারটি কোনওভাবে (শারীরিকভাবে বা কার্যকারণে) সিগনিফাইডের সাথে সরাসরি সংযুক্ত থাকে।
  • গ. প্রতীক (সিম্বল) – সিগনিফায়ার এর সাথে সাদৃশ্যযুক্ত নয় (মৌলিকভাবে স্বেচ্ছাচারিত বা একেবারে প্রচলিত)

তিনটি ভাগ হলেও বৃহত্তর অর্থে এগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। প্রতিটি চিহ্নেই এই তিনটি বৈশিষ্ট্য বা চরিত্র বিদ্যমান থাকে।

সিগনিফায়ার ও সিগনিফাইড এর অর্থ হলো কোন ‘চিহ্ন’ আমাদেরকে কী ধারণা দেয়; অর্থাৎ আমাদের মনে কোন বস্তুকে দেখে অর্থবোধক ভাবনা তৈরি। এটি একটি ‘‘ত্রিভুজ মডেল’’। যেমন: আমরা ‘কলম’ বলে একটি শব্দ উচ্চারণ করলে, তা যদি হয় কলমরূপ বস্তুর ‘চিহ্ন’, তা হলে এর মনোজগতে ভাবনা হবে ‘সিগনিফায়ার’ আর বাস্তবের কলমটি হলো ‘সিগনিফাইড’। যদিও কোন কোন চিহ্ন তার সমাজ সংস্কৃতি ভেদেও নতুন অর্থ তৈরি করে।  (নন্দী, রাজীব (২০১৯): ‘সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ চলচ্চিত্রে প্রতীকের ব্যবহার: একটি চিহ্নতাত্ত্বিক পর্যালোচনা’, Litinfinite, ভারত)

সেমিওলজির ক্ষেত্রে রেপ্রিজেন্টেশন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যখন কোন আধেয় পাঠক/দর্শক/শ্রোতা/ভোক্তার কাছে তুলে ধরা হয়, তখন তাকে সাধারণ অর্থে পরিবেশন বা রেপ্রিজেন্টেশন বলা হয়। এর মানে হচ্ছে, ভাষার সাহায্যে অডিয়েন্সের কাছে বার্তা বা মেসেজ অর্থপূর্ণভাবে তুলে ধরা কিংবা সেটাকে উপস্থাপন করা। এই ভাষা হতে পারে আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র, সাহিত্য পেইন্টিং ইত্যাদি কাঠামোর উপর তৈরী।

রেপ্রিজেন্টেশনকে কাঙিক্ষত অডিয়েন্স কিভাবে গ্রহণ করবে সেই বিষয়টি অডিয়েন্সের সামাজিক পরিমন্ডল ও তার সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত থাকে। যেমন কালো বিড়াল আমাদের দেশ অশুভ হলেও জাপানে এটি শুভ চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তা হলে দেখা যাচ্ছে, অর্থ বা মিনিং তৈরিতে চিহ্ন একটি সমাজ-সংস্কৃতিতে প্রভাব বিস্তার করে।

আমরা যে সাইন বা চিহ্নের কথা বলছি, সেগুলো যেসকল অর্থ প্রকাশ করে, আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল, আমাদের পূর্বসঞ্চিত অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ইত্যাদির মাধ্যমে এনকোড করে নিয়েছি।

সিএস পিয়ার্স চিহ্নের সংজ্ঞা‍য় জানান, চিহ্নের ২ ধরণের অর্থ থাকে।

  • ডিনোটেশনঃ একটি চিহ্ন আসলে কী বুঝায়
  • কনোটেশনঃ একটি চিহ্নের অন্তর্নিহিত অর্থ

একটি চলচ্চিত্র, সাইনবোর্ড, চিত্র, ভিডিও বা পোস্টারের নির্দেশিত অর্থ বা ডিনোটেটিভ মিনিং থাকে। আমরা  যখন বাহ্যিক অর্থের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সাংস্কৃতিক অর্থ বা কোডগুলোকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করতে পারি ডিকোডিং পদ্ধতির মাধ্যমে, তখন সেই সাইনের গূঢ়ার্থ বা কনোটেটিভ মিনিং বের করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়। রোলাঁ বার্থ সেমিওটিকসের এই পদ্ধতি অনুসারে কাজ করার কথা জানিয়েছেন।

‘‘চিহ্নবিদ্যা পড়তে গিয়ে এমনসব বস্তুকে চিহ্ন বলে আমরা চিনতে পারি যেগুলোকে চিহ্ন বলে ভাবার কথা অভাবনীয়। চিহ্নবিদ্যা চিনিয়ে দেয় কোনটি কিসের চিহ্ন, কোন চিহ্ন কোন প্রকারের, কী চিহ্নে কী আসে যায়। আমরা যাকে বলি ‘অর্থ’ (Meaning) সেটা কিভাবে তৈরি হয়; আমরা যাকে বলি ‘বাস্তবতা’ সেটা কীভাবে নির্মিত হয়- এসব নিয়ে পঠন-পাঠন করে চিহ্নবিদ্যা‘’ (কবির, এহসানুল; ২০০৯: ‘চিহ্নবিদ্যার অ আ’, আলম খোরশেদ সম্পাদিত বিশদ সংবাদ, প্রথম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা)

 সেমিওলজির মাধ্যমে চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ

চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ বা ফিল্ম স্টাডিজের অঙ্গনে ১৯ শতকের শুরুর দিকে সেমিওলজিকে ভিন্নভাবে ফিল্ম এনালিসিস এর টুলস হিসেবে ব্যবহারের অস্তিত্বর কথা উঠে আসে। ফিল্মের সাইন বা চিহ্ন বিষয়ক ব্যাখ্যার জন্য রাশিয়ান ফর্মালিজম ঘরানার আইশেনবাউম এবং তায়ানানোভ এর কথা জানা যায়। ১৯১০ থেকে ১৯৩০ এই সময়কালে তারা কাজ করেছেন।

সিনেমার সেমিওলজিকাল ল্যাঙ্গুয়েজকে ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তাদের দুটি ভিন্ন পন্থা ছিল। তায়ানানোভ সিনেমার চিহ্ন বা সাইনকে আলো ও মন্তাজের মতো সিনেমাটিক পদ্ধতিতে সংকেত আকারে দৃশ্যমান বিশ্বকে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করার কথা বলেছেন। অন্যদিকে আইশেনবাউম চলচ্চিত্রের “অভ্যন্তরীণ ভাষা বা অন্তর্নিহিত ভাষা” এবং  ‘ভাষাগত চাতুর্যে’র মাধ্যমে দৃশ্যমান চিত্রের অনুবাদ করার কথা বলেন।

সেই সময়ে ধীরে ধীরে ফিল্ম সেমিওটিকস শব্দগুচ্ছের ব্যবহার শুরু হয়। সাইন প্রসেস (সেমোসিস), বা কোনও ক্রিয়াকলাপ, আচরণ বা কোনও প্রক্রিয়া যা অর্থের উত্পাদন সহ চলমান চিত্র বা চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত সাইনগুলোকে পাঠ ও তাদের ব্যাখ্যা করে ফিল্ম সেমিওটিকস।

চলচ্চিত্র-ভাষা ধারণাটি নিয়ে ১৯৬০ এর দশকে আরও গভীরভাবে অন্বেষণ শুরু হয়। তখন পোস্ট-স্ট্রাকচারাল ঘরানার চিন্তাবিদগণ প্রচলতি কাঠামোর সমালোচনা শুরু করেছিলেন। এছাড়াও, তখন সেমোটিকস একাডেমিয়া বা জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই ক্ষেত্রের প্রথম দিকের কাজগুলো সিনেমার অনুপ্রেরণামূলক, আইকনিক সাইন বা চিহ্নভাষার সাথে প্রাকৃতিক ভাষার তুলনা নিয়ে কাজ করেছে।

ছায়াছবির অর্থ দর্শকের সাথে ডিনোটেটিভ ও কনোটেটিভ উভয় পদ্ধতিতে যোগাযোগ তৈরী করে। শ্রোতারা যা দেখেন এবং যা শুনেন তা হ’ল ডিনোটেটিভ। ডিনোটেটিভ কোন কিছু সনাক্ত করার জন্য তাদের কোনও পৃথক প্রচেষ্টা করতে হবে না। একই সাথে এই শব্দগুলি এবং চিত্রগুলি দর্শকের কিছু নির্দিষ্ট অনুভূতি জাগ্রত করার বা ভিন্ন মেসেজ দেয়ার জন্য তুলে ধরা হয়েছে।

যেগুলো সাধারণভাবে চোখে দেখা যায় না। এসব হচ্ছে কনোটেটিভ। কনোটেটি মিনিং সাধারণত সংবেদনশীল, উচ্চমাত্রার, উদ্দেশ্য ব্যাখ্যামূলক হয়ে থাকে। এর ইন্টারপ্রেটেশন বা অনুবাদের সাথে সামাজিক মূল্যবোধ এবং আদর্শিক অনুমান জড়িত থাকে।

সেমিওলজির মাধ্যমে চলচ্চিত্র বিশ্লেষণের উদাহরন

সেমিওলজির মাধ্যমে চলচ্চিত্র পাঠের প্রচেষ্টা সময়ের সাথে সাথে বিস্তৃতি লাভ করেছে। ফিল্ম সেমিওটিকস ধীরে হলেও গ্রহণযোগ্য অবস্থান নিয়ে নতুন চিন্তা ও ধারণাকে ভিত্তি করে সামনে আগাচ্ছে। চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ বা অধ্যয়নের ক্ষেত্রে সেমিওলজির অংশগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। নির্মাতাগণ কখনো জেনে আবার কখনো স্বতস্ফূর্তভাবে সেমিওলজিকাল এলিমেন্ট ব্যবহার করছেন তাদের সিনেমায়।

সেমিওলজির মাধ্যমে চলচ্চিত্র বিশ্লেষণের উদাহরন হিসেবে আমি প্রথমে ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তৌকির আহমেদ পরিচালিত বাংলাদেশী চলচ্চিত্র অজ্ঞাতনামা থেকে কিছু বিষয় তুলে ধরবো।

একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির লাশ সংক্রান্ত জটিলতা এই চলচ্চিত্রের মূল আলোচ্য হলেও আমার মনে হয়েছে, এখানের কাহিনীর জমিনে আরো অনেক কাহিনী লুকিয়ে আছে। ডিনোটেটিভ মিনিংয়ের ভাঁজে লুকিয়ে আছে অসংখ্য কনোটেটিভ মিনিং। ওপেনিং শটে দেখতে পাই সবুজ (একটি চরিত্র) তার দাদার সাথে বাজার থেকে ফিরছে। হাতে চড়কি। পথে একটি কবুতর মৃত পড়ে আছে রাস্তায়। সবুজ জানতে চাইছে, দাদা, মরলে কী হয়? মরলে কি উড়তে পারে? গান গাইতে পারে?

মরলে উড়তে পারা কিংবা গান গাইতে পারা আর সবুজের হাতের কাগজের চড়কির ধীরলয়ে উড়তে থাকার সাথে আকাশের সাদা বিমানের উড়ে চলার একটা সহজ সমান্তরাল মিল খুঁজেতে চেয়েছেন পরিচালক। সাথে রেখেছেন পাখিটির কবর দেয়ার দৃশ্য। অনেকাংশে মনে হয়েছে, বাংলাদেশের মৃতপ্রায় শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বেহাল অবস্থার জানান দিতে চেয়েছেন তিনি।

একটি দৃশ্যে ভোর হতে দেখা যায়। নৌকায় লাশের কফিন। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে, আমার সোনাজাদুর মুখ, জগতের সবচে সুন্দর..আমার সোনাজাদুর ছোঁয়া, সবচে নরোম…। হতবিহব্বল বাবা হাতে ধরে আছেন কফিনের শরীর। ইঞ্জিনচালিত নৌকার শ্যালো মেশিন মাঝে মাঝেই কেশে উঠে ধোঁয়া ছাড়ছে। সেই ধোঁয়া যেনো একজন অসহায় বাবার কলজেপোড়া আগুনের উত্তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছিলো প্রকৃতিতে। এখানেও সেই কনোটেটিভ মিনিংয়ে ব্যবহার।

কেফায়েত প্রামাণিকের নাতি সবুজকে আমরা দেখতে পাই পাড় ধ্বসে যাওয়া একটি অংশে কলাপাতার ঠোঙা দিয়ে বানানো নৌকা ভাসিয়েছে। ডিনোটেটিভ মিনিংয়ে এই দৃশ্যকে একটি ছোট্ট শিশুর খেলায় দৃশ্যই মনে হবে। কিন্তু, আমার ব্যক্তিগত কনোটেটিভ ট্রান্সলেশন থেকে মনে হয়েছে, তাদের জীবনের অনিশ্চিত ও তথৈবচ অবস্থা এঁকে দেখাতে চেয়েছেন নির্মাতা।

আরেকটি উদাহরন হিসেবে আমি তারেক মাসুদের পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র রানওয়ে এর কিছু অনুষঙ্গ তুলে ধরছি। রানওয়ের পাশে ঝুপড়ি ঘরে বসবাসরত একটি পরিবারকে নিয়ে সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে। তারেক মাসুদ তার অন্যান্য নির্মানের মতো এই সিনেমাতেও লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানকে প্রয়োজনমতো সিনেম্যাটিক কোড হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

সিনেমার পটভূমির পুরোটা জুড়েই লোকজ আবহ পাওয়া যায়। বিমানবন্দরের পাশেই গ্রামীন আবহের বৈপরীত্য এখানে একধরণের কনোনেটিভ মিনিং তৈরী করেছে। জলাশয়, ডোবা, মাছ ধরার জাল, গোয়ালঘর, গ্রামীণ থালাবটি, জলচৌকি, হাঁস- মুরগী, জীর্ণ বেড়া ইত্যাদি সবকিছু মিলে শহরের উন্নত স্থাপনা বিমানবন্দরের পাশে একখন্ড গ্রাম যেনো তার উপস্থিতি ঘোষণা করছে।

একটি দৃশ্য এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। ছেলেটি ঘরে ফেরার পরদিন খুব সকালে বাড়ির উঠানে এসে জলচৌকির ওপর বসে। তার আশপাশে ঘটে চলা কিছু ঘটনাখন্ড তার মনোযোগ আকর্ষণ করে। ছেলেটি দেখে, শেষ বিকালের সোনালি রোদ গায়ে মেখে ঘাসফুলের ওপর ফড়িং এসে বসছে। জালে আটকে থাকা পানিতে সোনালি আলো পিছলে যাচ্ছে। জালে ধরা পড়া কিছু ছোট মাছ লাফাচ্ছে। পিঁপড়ার দল সারি বেঁধে হেঁটে যাচ্ছে কোথায়..। ঝিঙে ফুল বাতাসে দুলছে, মা দুধ দোয়াচ্ছে।

ছেলেটির পয়েন্ট অব ভিউ থেকে দেখানো এই দৃশ্যগুলোর পৃথকভাবে কোনো অর্থ নেই। কিন্তু যখনই দৃশ্যগুলোকে আমরা তার জীবনের বর্তমান কনটেক্সটের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে চাইবো, তখনই আলাদা দৃশ্যখন্ডগুলো অর্থবহ হয়ে উঠবে। আমাদের মানসিক ট্রান্সলেটর তখন দৃশ্যগুলোকে ছেলেটির মনের আনন্দের বার্তাবহ অনুষঙ্গ হিসেবে অনুবাদ করবে। এটিকেই আসলে ‘ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজ’ বা ‘মন্তাজ অব অ্যাট্রাকশন’ বলা হচ্ছে। আমরা যাকে সাধারণ কোন ডিনোটেটিভ বিষয়ের কনোটেটিভ মিনিং বলে বুঝতে চাইছি।

যেকোন সিনেমাতে কনোটেশনের বিষয় মনে হলে  হংকংয়ের প্রখ্যাত মুভি ডিরেক্টর ওয়াং কার-ওয়াই এর সিনেমা ‘দ্য গ্র্যান্ডমাস্টার (২০১৩)’ এর কথা প্রথমেই আমার মনে পড়ে। এটি একটি অনন্য মার্শাল আর্ট ফিল্ম। যুদ্ধ, কৌশল এবং মার্শাল-আর্টের অনুশীলনের উপর অনেক দুর্দান্ত শট উপস্থাপন করে তৈরী সিনেমাটিতে প্রচুর পরিমাণে সেমিওলজিক্যাল এলিমেন্টের ব্যবহার দেখা যায়। এটি দুর্দান্ত চীনা মার্শাল আর্ট মাস্টারদের-বিশেষত আইপ ম্যানকে রিপাবলিকান যুগের অবস্থান তুলে ধরে।

সেইসাথে জাপানের মনচুরিয়া দখল, চীনের উত্তর পূর্বাঞ্চল এবং হংকংয়ের বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ব্রিটিশ উপনিবেশকরণের কারণে স্থানীয় সামাজিক পরিবর্তন ও শতাব্দী-প্রাচীন মার্শাল আর্টের পারফরম্যান্সের শটগুলির সাথে মিলিত হয়ে চমৎকার একটি যৌগিক আধেয়তে রূপ নিয়ে। চলচ্চিত্রটিতে জল, বৃষ্টি, তুষারপাত, আগুন এবং ধোঁয়া প্রবাহিত, ঝাপটা এবং স্থানীয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কোড যুক্ত হয়ে একটি চলমান ক্যানভাসকে জীবন্ত করে তুলেছে।

দৃশ্যমান বার্তার ভেতর দিয়ে চিহ্ন আমাদের অন্য আরেক স্তরের বার্তা দিয়ে থাকে। আমরা দুচোখ দিয়ে যা দেখি, মন দিয়ে যা ভাবি, এর প্রতিটি চিহ্নের এক-একটি বার্তা আছে। এই চিহ্নের ব্যবচ্ছেদ নিয়েই সেমিওলজির কাজ। একজন শিল্পীর গুরুত্ব নির্ভর করে, তিনি ঠিক কী পরিমাণ চিহ্নের ভাষাকে সাধারণের পাঠযোগ্য ভাষায় রূপ দিতে পারেন, তার উপর ভিত্তি করে।

সিনেমা কিংবা ভিজ্যুয়াল আর্টের সব ধরণের মাধ্যমেই এই চিহ্নবিদ্যা বা সেমিওলজির কারিশমা বিদ্যামান। তাই, চলচ্চিত্রকে পাঠ করতে হলে সেমিওলজি বিষয়ে জ্ঞানের কোন বিকল্প নেই।

 

তথ্যসূত্রঃ

  1. নন্দী, রাজীব (২০১৯): ‘সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ চলচ্চিত্রে প্রতীকের ব্যবহার: একটি চিহ্নতাত্ত্বিক পর্যালোচনা’ (https://shorturl.at/imsJZ), Litinfinite, ভারত।
  2. আউয়াল, সাজেদুল (২8 জুন ২০১২): ‘তারেক মাসুদ তাঁর লোকচলচ্চিত্র’ (https://shorturl.at/fjtxO), কালি ও কলম, ঢাকা।
  3. কবির, এহসানুল (২০০৯): ‘চিহ্নবিদ্যার অ আ’,’ আলম খোরশেদ সম্পাদিত বিশদ সংবাদ, প্রথম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা, ঢাকা।
  4. DOLE, P. (1991). Semiology—A Study of Signs. India International Centre Quarterly, 18(4), 31-57. Retrieved June 19, 2021, from http://www.jstor.org/stable/23002244
  5. Britannica, T. Editors of Encyclopedia (2020, May 21). Semiotics. Encyclopedia Britannica. https://www.britannica.com/science/semiotics
  6. Asyraq Pauzan, Alfan (2018). A Semiotic Analysis of the John Wick 1 Film Using Charles Sanders Peirce’s Semiotic Theory. Indonesia. A Thesis for the Degree of Sarjana Humaniora in English and Literature in Alauddin State Islamic University of Makassar. Retrieved 2018, from https://shorturl.at/btH27

মন্তব্য করুন

error: ধন্যবাদ আপনাকে, কপি করতে চাওয়ার জন্য!