আমার সাইকেল চালানো শেখার জটিল জার্ণি ও বিডি সাইক্লিস্টস

-ভাই, একটু সোজা হইয়া বসেন!
-আরে মিয়া, এমনে নড়াচড়া করলে হইবো! আজব পাবলিক!
-খাড়ান খাড়ান…থামেন ভাই। আপনেরে আমি সাইকেল চালাইন্না হিগাইতে পারুম না। এমন পাত্থরের মতোন শরীল লইয়া আমনেরে দিয়া সাইকেল চালাইন্না হইবো না।

আমার অসংখ্যবার সাইকেল চালানো শেখার এক বারের আলাপ এটি। ছোটবেলা থেকে সাইকেল নিষিদ্ধ ছিলো আমার পরিবারে। কঠিন নিয়মের মধ্যে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনার কারণে সাইকেলে চড়া কিংবা সাইকেল চালানোর কোন সুযোগই ছিলো না। কিন্তু, তারপরও বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে সাইকেল চালানো শিখার চেষ্টা করেছি। পারি নি। উপরের সংলাপটি আমাকে সাইকেল চালানো শিখাতে চেষ্টা করা একজন মাস্টারের। 🙂

তারপর শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে গেছে দু’চাকার সাইকেল ছাড়াই। যখন আমরা বাবার চাকরির সুবাদে চিটাগাং থাকতাম, তখন আমাকে ৩ চাকার একটা খেলনা রিকশা কিনে দেয়া হয়েছিলো। প্রতিদিন বিকালে আমি, রুবেল, জিসানসহ ফায়ার সার্ভিস কলোনীর আরো বন্ধুরা বেরিয়ে পড়তাম। প্যারেড মাঠে আমাদের রিকশা চালানোর ধুম পড়তো। মাঝে মধ্যেই গার্ড আঙ্কেলরা এলোমেলো ছুটতে নিষেধ করতেন। কিন্তু, হাতে খেলনা ওয়াকিটকি আর ডাবল পকেটওয়ালা শার্ট পড়া আমার নিজেকে তখন নায়ক মনে হতো। মনে হতো, বড় হলে আমি সুপারকপ হবো! কখনো কখনো বাসার শোকেসে যত্ন করে সাজিয়ে রাখা প্লাস্টিকের লাইটজ্বলা খেলনা পিস্তলও সাথে থাকতো। আহা! আমার শৈশবের নায়ক সাজার দিনগুলো এখন কোথায়!

শহরের সবকিছু ছেড়ে আমরা পাকাপাকিভাবে গ্রামে ফিরলাম। প্রতিবেশিদের অনেকেই তখন সাইকেলে যাতায়াত করতো। কিন্তু, অদ্ভূত কোন কারণে আমার বাবা-চাচাদের কারো সাইকেল ছিলো না। ফলে সাইকেল আমার ধরাছোঁয়ার বাইরেই ছিলো সবসময়। সমবয়সীদের প্যাডেলে ভর করে সাই সাই উড়ে যেতে দেখতাম। তখন এই বিদ্যেটা না জানার কষ্ট আমাকে বিরক্ত করতো। বাজারে আলীর দোকান নামে একটা দোকান ছিলো। ওখানে ঘন্টাপ্রতি ভাড়ায় সাইকেল পাওয়া যেতো। পিঠাপিঠি বয়সের চাচাতো ভাই স্কুল ফাঁকি দিয়ে সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। আমাকে ভেঙচি কেটে বলতো, “শহরত্থে আইছে। সাইকেলই চালাইতে পারে না। বলা কোনহানকার!”

এরকম সব দুঃখ নিয়েই কখন যেনো শৈশব-কৈশোরের কাল শেষ করে ততোদিনে বড় হয়ে গিয়েছি। কখনো শেখা হবে না সাইকেল, এটা যেনো মেনেই নিয়েছি। একদিন পরিচিতদের সূত্র ধরে ফেসবুকে বিডি সাইক্লিস্টস এর সাথে পরিচয়। কৌতুহলবশত গ্রুপে যুক্ত হলাম। সবার নিয়মিত রাইডের গল্প শুনি। ছবি দেখি। বাইক ট্রাভেলিং এর সাথে পরিচয় হয়। তখন সাইকেল না চালাতে পারার কষ্টটা আরো বাড়ছে নিয়মিত। কিন্তু, অতীতের সেই ’পাত্থরের মতো শরীর’ আরো ভারী হয়েছে। এই ভয় আর সংকোচে শেখার সুযোগ করতে পারছিলাম না।

একদিন বিডিসির বিগেনার্স লেসনের পোস্ট দেখলাম। সাইকেল লাগবে না। টাকা-পয়সা কিচ্ছু লাগবে না। সাইকেল চালানো শিখাবে। আমি অবাক! এমন ফ্রি সার্ভিস কেউ দেয় নাকি!! তারপর, কয়েকসপ্তাহ অপেক্ষা করে করে একদিন স্লট বুকিং দিতে পারলাম। নির্ধারিত দিনে আবাহনী মাঠে গেলাম। পরিচয় হলো রেজওয়ান ভাই, রোহান ভাই, সিফাত ভাইদের সাথে। প্রথমে টুকটাক ইন্সট্রাকশন দিয়ে সাইকেল হাতে দিলেন। সাইকেল হাতে নিয়ে হাঁটলাম। মাটিতে ভর করে করে সাইকেল চালাতে চেষ্টা করলাম। ইন্সট্রাকটর ভাইয়ারা বলছিলেন, আরে, কোন ব্যপারই না সাইকেল চালানো। আমারতো মনে মনে সেই পুরনো ভয় কাটে না। তবুও সহজ কসরৎ করতে থাকলাম।

একটু পর দেখি আমি সাইকেল চালাতে পারছি!! আমার পাত্থরের মতো ভারী শরীর কোন সমস্যা করছে না। একটু তাল হারালেও আমি সাইকেল নিয়ে একা একা ছোট ছোট চক্কর দিতে পারছি! সেদিন কী পরিমাণ খুশি লেগেছিলো, বলে বুঝাতে পারবো না।

সাইকেল চালাতে শেখার পরপরই বাইকফেস্ট আয়োজন করলো বিডিসি। সেখান থেকে ছাড়ে একটা খুব সাধারণ দামের সাইকেল নিয়ে নিলাম। নিজের পকেটে টাকা ছিলো না বলে ঋণ করে কিনলাম আমার সাইকেল। ফনিক্সের সেই সাইকেল আমাকে অনেককিছু দিয়েছে। আমার প্রথম বাইক ফ্রাইডে, প্রথম স্বাধীনতা দিবস রাইড, প্রথম ১০০ কিলো রাইড, ৩ দিনের বরিশাল সার্কিট রুট রাইড সহ আরো অসংখ্য সুন্দর মুহুর্ত আমি পেয়েছি।

সাইকেল শেখার সবচে দামী যে অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে এবং হচ্ছে, সেটি হচ্ছে বিডিসি এবং এর সাথে সম্পৃক্ত কিছু মানুষ। এই মানুষগুলো আজকালের কমার্শিয়াল সময়েও নিরলসভাবে অন্যদের জন্য কাজ করছেন। বিডিসি চাইলেই পারতো, বিজনেস এনটিটি হিসেবে দাঁড়াতে। সুযোগ ছিলো এবং আছে নানা রকমের আর্থিকভাবে লাভবান হবার সুযোগ। কিন্তু, বিডিসির পেছনের এইসব মানুষগুলো নির্মোহ থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। একটি সফল সোস্যাল রেভুলেশন ঘটিয়েছেন।

সাইকেল এখন প্রয়োজন, ফ্যাশন, নিত্যকার সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের অনেকের। তবুও, তাঁরা নির্বিকার। গিনেসবুকে নাম লিখিয়েছে সাইক্লিস্টরা। এইসব অর্জনের পেছনে যারা আন্তরিক ভালোবাসা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা রইলো। আপনারা না থাকলে, বিডিসি না হলে হয়তো আমার কখনো সাইকেল চালানোর এই সুযোগটা হতো না।

বিডিসির জন্মদিন আর আমার জন্মদিন একইদিনে। এই কাকতালীয় ব্যপারটার জন্য প্রতি জন্মদিনেই বিডিসির বার্থডের কথা মনে পড়ে। শুভ জন্মদিন প্রিয় বিডিসি! আমাদেরকে এমনভাবে ইন্সপায়ার করতে থাকো।

মন্তব্য করুন

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন