যন্ত্রপাখির ডানায় চড়ে প্রথমবারের উড়ান

লোহার বানাইনন্যা বিমানডা এতো মানুষ লইয়া ক্যামনে উড়ে!!! শৈশবে আকাশে বিমান উড়ে যেতে দেখলেই প্রশ্নটা মাথায় ঘুরতো। তখন আমরা চিটাগাংয়ে থাকি। আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিস কোয়ার্টারে। বিমানের শব্দ আমার কাছে মহাজাগতিক ইস্রাফিলের শিঙ্গায় ফুঁ দেয়ার শব্দের মতো মনে হতো। সেই সময়ে আমার একজন আত্মীয় আমাকে চিটাগাং বিমানবন্দরে বেড়াতে নিয়ে গেলেন। তিনি আবহাওয়া অধিদপ্তরে তার কাজের সুবাদে বিমানবন্দরের ভেতরে যাওয়ার সুবিধা কীভাবে যেনো আমার জন্যও আদায় করেছিলেন। রানওয়ের পাশের খালি জায়গায় ছোট কয়েকটি বিমান দেখেছিলাম বলে আবছা করে মনে পড়ছে।

সেদিন উনি বিমানের নানান গল্প শুনিয়েছিলেন। তখন খুব একটা মাথায় না থাকলেও পরবর্তীতে যখন স্কুলে ভর্তি হই, তখন সাধারণ জ্ঞান বই থেকে জানতে পারি রাইট ভাইদের কথা। যারা প্রথম সফলভাবে বিমান উড়িয়েছিলেন। আমার কৌতুহলের পালে হাওয়া লাগে। টুকটাক করে পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় রাজকুমারদের সাত সাগর পাড়ি দেয়া গল্প পড়ি। ইকারাসের মোমের ডানা যখন সূর্য এর তাপে গলে যায়, তখন ইকারাসের জন্য মন খুব খারাপ হয়েছিলো আমার। তারপর রাইট ভাইদের চেষ্টার বিস্তারিত জানা হয়। আস্তে আস্তে বিমান বিষয়ক জ্ঞানের পরিধি খানিকটা করে বৃদ্ধি পেতে থাকে।

আমার পড়াশোনার জন্য আমাকে ফিরতে হয় ঢাকাতে। হোস্টেলে এসে পরিচয় হয় অর্ণব নামের দুর্দান্ত মেধাবী একজন কিশোরের সাথে। বয়সে কিছুটা বড় অর্ণব ছিলো আমাদের জন্য গল্পবলা ম্যাজিশিয়ান। নতুন অসংখ্য বিষয়ের তথ্যভান্ডার খুলে বসতো সে। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম ওর কথা। রাজ্যের হাজারো অনুষঙ্গ আমাদের সামনে তুলে ধরতো পরম আন্তরিকতায়। ওর আঙ্কেল চাকরি করতেন বাংলাদেশ বিমানে। অর্ণবের বিমানে চড়া, এয়ারপোর্টের রানওয়েতে হাঁটার অভিজ্ঞতা ছিলো। কিশোর অর্ণবের জানা ছিলো অনেক দেশের বিভিন্ন মডেলের বিমানের কথা। ওর কাছেই আমি প্রথম শুনি, বিমান আসলে লোহার তৈরী হয় না। বরং, বিশেষ ধরণের এলুমিনিয়াম থেকে বিমানের জন্ম হয়।

বিমান যে নিজের খেয়ালখুশি মতো আকাশে উড়তে পারে না, বিমানেরও যে রাস্তা (রুট) আছে, এই তথ্যটি ওর কাছেই প্রথম শুনি। বিমানের ভেসে থাকার জন্য ইঞ্জিনে তেলও ভরতে হয়! কিংবা, বিমান বালারা দেখতে পরীদের মতো হয়, কয়েকতলা উচ্চতার বিমানও আছে ইত্যাদি বিমান বিষয়ক জ্ঞানের গুরু অর্ণব। ও খুব দারুন সুন্দর ভঙ্গিতে গল্প বলতো। যেনো ম্যাজিশিয়ান তার সমস্ত সামর্থ্য দিয়ে তাজমহল ভ্যানিশ করে দিচ্ছে! এয়ারফোর্স ওয়ান নিয়ে কোন এক মুভির কথা ও আমাদের সবিস্তারে শোনাতো প্রায়ই। এভাবেই বিমানের প্রতি অন্যরকম একটা ভালোবাসা কিংবা আগ্রহ তৈরী হয়েছিলো আমার।

একটু বড় হতেই বুঝতে পারি, পাইলট কিংবা বিমান ক্রু হবার মতো সুযোগ নিয়ে আমি আসি নি। আমার চোখের পাওয়ার, শিক্ষাগত ট্র্যাক আমাকে বিমানে উড়ার কোন ধরণের ক্যারিয়ার বেছে নিতে দিবে না। এই বুঝে যাওয়াটা আমার জন্য বেশ কষ্টের ছিলো। ততোদিনে বিমানের প্রতি ভালোবাসা প্রমাণ সাইজে রূপ নিয়েছে। তারপর সময়ের চরকিটানে কেটে গেছে বহু মুহুর্ত। আমি বড় হতে হতে তালগাছের মতো হয়ে উঠেছি। বিমানের প্রতি ভালোবাসার তীব্রতা যত্নের অভাবে ফিঁকে হয়ে এসেছে। কিন্তু, আমি তখনো বিমানে চড়তে পারি নি। নিজের আর্থিক অবস্থা আমাকে অনুমতি দিতো না কখনো। বিমানের একটি ডোমেস্টিক ফ্লাইটের টিকেটের দামে আমার একমাসের হোস্টেল খরচ মেটানো যেতো। দীর্ঘ একমাস খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়ার কোন উপায় ছিলো না। ফলে, সেই সাহসও করা হয়ে উঠে নি।

এরমধ্যে ক্যালেন্ডারের পাতা বদলাতে থেকেছে। দৈনিকের ব্যস্ততা, অজুহাত, অভাব ইত্যাদি মিলিয়ে আর কখনো আকাশে উড়ার চেষ্টা করি নি। গতবছর (২০২০) হঠাৎ করে পৃথিবীজুড়ে মহামারী নেমে আসলো। করোনার কারণে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও লকডাউন শুরু হয়। স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালতসহ সবকিছু বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। নিত্যকার ব্যস্ততায় ফুলস্টপ পড়ে। এমন দীর্ঘ বন্ধ আমার স্মৃতিতে নেই। চারপাশের মৃত্যুর খবর, মানুষের অসহায়ত্ব, অর্থনৈতিক দৈন্যতার হাহাকার আমাদের বিষণ্ন করে তুলেছে। অনলাইনে কাজ কর্মের সুবাদে কোনরকম নাক উঁচু করে টিকে থাকতে পারলেও করোনার ধাক্কা আমাদের সেক্টরেও বেশ ভালোভাবেই লেগেছে। কষ্টকর এই মুহুর্তগুলো সহজ করে নেয়ার সুযোগ কিংবা সামর্থ্য আমাদের সবার পক্ষে হয় নি।

এই অবস্থার মধ্যেই হঠাৎ একদিন মনে হলো, এবার বিমানে না চড়া হলে আর কখনো হয়তো হবে না। মৃত্যুভয় হয়তো অবচেতনে আমাকে তাড়িত করছিলো। হুট করেই বাংলাদেশ বিমানের ঢাকা টু কক্সবাজারের টিকেট কেটে ফেললাম। মাসখানেক আগে টিকেট বুকিং দেয়ায় বেশ বড় অংকের ছাড়ও পাওয়া গিয়েছিলো। করোনার প্রকোপ তখন কিছুটা কম। সীমিত আকারে ফ্লাইট চালু হয়েছে। আমি আর অন্তরা ফ্লাইটের কনফার্মেশন পেয়ে ভীষণ খুশি। নির্ধারিত দিনে আমরা এয়ারপোর্টের ডোমেস্টিক এরিয়া থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটা চমৎকার ইন্টারন্যাশ ফ্লাইট বিমানে কক্সবাজারের জন্য রওনা হই। বিমান যখন ট্যাক্সিং করে রানওয়ে পার হচ্ছিলো, আমার মাথায় তখন ছোটবেলা থেকে বিমান নিয়ে জানা সব তথ্য/কাহিনী ফ্ল্যাশ করে যাচ্ছি একের পর এক।

একসময় সাইঁ করে আকাশে উড়তে শুরু করলো যন্ত্রপাখি। একটু একটু করে উপরে উঠছিলাম। আমি বিমানের জানালা দিয়ে চারপাশে দেখার চেষ্টা করছি। সারি সারি তুলোটে মেঘের ভেতর দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। সূর্যের উজ্জ্বল আলো পিছলে যাচ্ছে মেঘেদের শরীর ছুঁয়ে। বহু নীচে তখন ঢাকার আবছা আউটলাইন দেখা যাচ্ছে। দূরে কোন নাম না জানা নদীর আঁকাবাকা শরীর ছড়িয়ে আছে অলস। আমার মুগ্ধতা তখন থমকে আছে। মেঘের নানা রকম শেপ, ফর্মেশন, তাদের নানান ধরণে ভেসে যাওয়া কিংবা থমকে থাকার চিত্র অন্যরকম সুন্দর হয়ে ভেসে আছে। পাখির পালকের মতো সিরাস কিংবা অলক মেঘ, পরতে পরতে ভাঁজ হয়ে থাকা স্ট্রাটাস কিংবা স্তর মেঘ, স্তুপাকৃতির কিউমুলাস (Cumulus) বা ছায়া মেঘসহ এমন ভিন্নধর্মী মেঘেদের আলাদা করা যাচ্ছিলো দূর থেকেই।

সূর্যের আলোয় ঝলসে যাচ্ছে আকাশের শরীর। আমরা উড়ে যাচ্ছি যন্ত্রডানায় চড়ে। চলতে চলতে একসময় চলার সময় শেষের পথে আসলো। তখন কর্ণফুলির উপর দিয়ে আমরা যাচ্ছি। নীচে দেখা যাচ্ছে একপাশে আদিগন্ত বিস্তৃত সাগর। অন্যপাশে পাহাড়, জমিন, বসতি। বন্দর এলাকার বিশাল অংশ জুড়ে নোঙর করে রাখা জাহাজগুলোকে মানচিত্রের ক্ষুদ্র ডটের মতো মনে হচ্ছিলো। কিছুক্ষণ পরেই কক্সবাজার। বিমানের ইন্টারকমে পাইলটের ঘোষণা শুনতে পেলাম। একটু পরেই যন্ত্রপাখি তার মুখ নীচু করে নামতে শুরু করলো। আকাশ থেকে ভূমিতে নামার ব্যস্ততা টের পাচ্ছিলাম। আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে বিশ্রামের জন্য তাড়াহুড়ো করছে যেনো বিমানটি। কক্সবাজার এয়ারপোর্টের রানওয়ে দেখতে পেলাম। কিন্তু, হঠাৎ করে নামা বন্ধ করে আবার উড়তে শুরু করলো বিমান। যাত্রীরা অবাক হয়ে একে অপরের দিকে দেখছিলো। পাইলট জানালেন, রানওয়েতে পাখির জন্য এই মুহুর্তে নামার বিষয়টি অনিশ্চিত। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সিগন্যাল দিলেই আমরা নামবো।

পরের প্রায় ৭/১০ মিনিট আমাদের বিমান ইতস্তত চক্কর খেলো কক্সবাজার সৈকত এলাকায়। একসময় সিগন্যাল পেয়ে আমাদের বিমান মাটিতে নেমে আসলো। বিমানের পেট থেকে বেরিয়ে আসা সিঁড়ি দিয়ে আমরা মাটিতে পা রাখলাম। সংক্ষিপ্ত এই জার্ণি অনেকের জন্যই একঘেয়ে লাগছিলো বলে মনে হয়েছে তাদের দেখে। নিয়মিত যারা যাতায়াত করেন, তাদের কাছে ডালভাত। কিন্তু, আমার মতো নূন আনতে পান্তা ফুরোয় মানুষদের জন্য এটি একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা। প্রথমবার সবকিছুর অভিজ্ঞতা আমাদের স্মৃতিতে গাঢ় ছাঁপ রেখে যায়। করোনার এই অনিশ্চিত আতঙ্কের সময়ে বিমান জার্ণির ইভেন্টটি আমার জন্য একধরণের ব্যক্তিগত অর্জন মনে হয়েছে। শুনতে হাস্যকর শোনালেও বিষয়টিকে আমি এভাবেই মনে রাখতে চেয়েছি।

যদি বেঁচে যাই এই সংকটের সময়, তাহলে হয়তো করোনাকাল পার হলে আমার আবার কখনো বিমান জার্ণির সুযোগ হবে। এরোপ্লেনের খোলসের ভেতর থেকে বাইরের মেঘেদের দেশ দেখতে দেখতে হয়তো ভাববো নতুন কোন সময়ের কথা। কিংবা মনে পড়বে মোমের ডানায় আকাশ পাড়ি দেয়া ইকারাসকে। মুক্ত আসমান জুড়ে জালের মতো প্যাচ খেয়ে ঝুলে আছে যন্ত্রপাখিদের উড়ে চলার আকাশপথ। একেকটি পথ ধরে এ্যালুমিনিয়ামের ডানায় চড়ে ভেসে চলছে অসংখ্য মানুষ। তাদের স্বপ্ন, ভালোবাসা, নতুন করে বাঁচার আকাঙক্ষা, শোক, প্রিয়জনের অপেক্ষা ইত্যাদি সবকিছুই উড়ে যাচ্ছে আকাশের গায়ে ছড়িয়ে থাকা রাস্তা ধরে।

আমিও হয়তো কখনো পৌঁছুবে কোন দূরদেশের শান্ত কোন মফস্বল শহরে। যেখানে কোন ছোট্ট নদীর পাশে নিজের একটি একান্ত মাথা গোজার ঠাঁই থাকবে। শীতের রাতগুলো তখন হয়তো সুদীর্ঘ হবে। কোন তাড়াহুড়ো থাকবে না। থাকবে না কোন লক্ষ্যস্থির করা ব্যস্ততা। সহজ ও নিস্তরঙ্গ সেই সময়ের কাছে আমাকে হয়তো কখনো নিয়ে যাবে কোন সগর্জনে উড়াল দেয়া যন্ত্রপাখি। আমি অপেক্ষায় থাকি…।

মন্তব্য করুন

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন