আমাদের শহরে ইতস্তত টিকে থাকা এক পেঙ্গুইন

সাইবেরিয়া কিংবা এন্টার্কটিকার বরফ সব গলে গেলে পেঙ্গুইনরা কোথায় যাবে, এমন চিন্তা ছোটবেলায় আমার মাথায় প্রায়ই আসতো। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক কিংবা ন্যাটজিও চ্যানেলে প্রাণীজগতের নানা কাহিনী দেখার সুযোগে আমি তখন পেঙ্গুইনদের সম্পর্কে খানিকটা জানতাম। তারপর বহুবছর কেটে গেছে। একদিন হঠাৎ আমাদের ইউনিভার্সিটিতে এক পেঙ্গুইনের দেখা পেয়ে আমি অবাক! গ্রীষ্মপ্রধান দেশে এখন তাপমাত্রা বাড়ছে চরম মাত্রায়। ভরদুপুরে মনে হয় তন্দুর রুটির চুলায় বসে আছি। এখানে পেঙ্গুইন কীভাবে আসবে!

গুটি গুটি পায়ে একজন এগিয়ে এসে আমার পাশের বন্ধুর সাথে কুশল বিনিময় শেষে আমার সাথেও পরিচয় হলো। তখন জানা গেলো, চলাফেরায় পেঙ্গুইন ভাব থাকলেও তিনি আসলে একজন পুরোদস্তুর মানুষ! একদমে খলবল করে কথা বলছিলো। আমার সাথে সেদিন তেমন কথা বলতে আগ্রহ দেখান নি তিনি। হয়তো ভেবেছিলেন, কী অদ্ভূত ছেলে!

তারপর আরো দিন গেছে পায়ে পায়ে। মিরপুর বাসে একটা দারুন গ্রুপের সাথে আমার সখ্যতা তৈরী হয়েছে। সেখানে সেদিনের সেই পেঙ্গুইনও আছে। আমি আমার চারপাশের সবকিছুকে নিজের মতো করে খুব ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করি। অনেককিছুই অতি মনোযোগের কারণে হয়তো চোখ এড়িয়ে যায়। তবুও, চেষ্টা করি দেখতে।

আমি সেদিনের সেই ছটফটে উচ্ছল পেঙ্গুইনকে দেখি। উঁচু ভলিউমে কথার খই ফুঁটে। রাস্তার উল্টোদিকের লেন দিয়ে যখন ভার্সিটির বাস চলে, তখন ও যাত্রীদের দিকে তাকিয়ে স্যরি বলে অনিয়ম করেছে বলে। অক্সিডেন্টের জন্য দায়ী বাস ড্রাইভারের জন্যও ওর মায়া হয়। আমার ক্ষুধার সময়ে ভাত খাওয়াতে না পারার অক্ষমতার জন্য ওর কষ্ট হয়। বন্ধুদের মন খারাপ থাকলে ওর কান্না পায়। নিজের মানিব্যাগ উজাড় করে দিয়ে ফেরিওয়ালা খালাদের কাছ থেকে অপ্রয়োজনেই নানা জিনিস কিনে ব্যাগ ভর্তি করে। কার্টুন আর এ্যানিমে যে এক জিনিস নয়, সেটা প্রমাণ করার জন্য উঠেপড়ে ঝগড়া করে। বাসের জানালার পাশের সিট দখল করার জন্য ওর নাটকের কোন শেষ থাকে না।

এই সবকিছু আমরা দেখি। কিন্তু, এর বাইরে আমি আরো অনেককিছু দেখতে পাই। পেঙ্গুইনের চারপাশের শূন্যতার অনুবাদ করার চেষ্টা করতে গিয়ে আমি চমকে উঠি। সারাক্ষণ হৈ-হুল্লোড়ের মধ্যে থাকা মানুষটির মধ্য সযতনের লুকিয়ে রাখা আবেগ, অস্পৃশ্য কষ্ট, শব্দহীন অসংখ্য কান্নার মুহুর্ত, প্রিয় মানুষদের জন্য জমিয়ে রাখা অব্যক্ত ভালোবাসার সংগ্রহ দেখে আমি অবাক হই। ভীষণ ভালোবাসা কিংবা আবেগ প্রকাশ না করতে পারলে আমরা কষ্ট পাই। কিন্তু, এই পেঙ্গুইন অনায়াসে নিজের মধ্যে এইসব বাক্সবন্দি করে রাখে।

আমি জানি না, কখনো সেই বাক্সবন্দি রহস্যের হদিশ কেউ পাবে কিনা। কিংবা, আদৌ সেই রহস্য প্রকাশের কোন প্রয়োজন আছে কিনা, সেটাও আমার জানা নেই। আমি শুধু বুঝতে পারি, পেঙ্গুইনটি বাহ্যিক আড়ম্বরের মোড়কে নিজেকে টিকিয়ে রাখছে। আমার মনে পড়ে অসংখ্য টুকরো টুকরো স্মৃতিচারণ। ফার্মগেটের মোড়, কোচিংয়ে ভীরু চোখে পছন্দের কাউকে খুঁজতে চাওয়া, স্কুল-কলেজের নানা চড়াই-উৎড়াই, প্রত্যাশার চাপ, সবকিছু মিলেমিশে জীবন ওর চারপাশে বয়সের গাঢ় ছাঁপ এঁকে দিয়েছে।

নেটজিও কিংবা জিওগ্রাফিকে সাদা-কালো ডোরার পেঙ্গুইনগুলো যখন শুভ্র বরফের উপর গড়িয়ে চলতো, মনে হতো আদিগন্ত বিস্তৃত একটি ফ্রেমে পেইন্ট করছে কোন শিল্পী। কোন ক্লেদ নেই-নোংরা নেই। ধবধবে বরফের মাঝে অসাধারণ মনে হতো দেখতে। আমি আমার গল্পে এই পেঙ্গুইনকেও সেভাবেই চলতে দেখি। অগণিত দুঃখ-কষ্ট-কান্না-বিরক্তি ওর চলার পথকে দ্বিধান্বিত করে।

প্রিয় মানুষটির জন্য অপেক্ষার প্রহর শেষ হতে হতেও হয়ে উঠে না। নিত্যদিনের দেখা মানুষগুলোকেও অচেনা হয়ে যেতে দেখে আমাদের পেঙ্গুইন। কখনো হয়তো অঝোরে অশ্রু ঝরে। কিন্তু, সেসব কিছুই যেনো ওকে স্পর্শ করে না। খলবল করা কৈ মাছে ঝাঁকের শব্দের মতো করে কথা বলে পেঙ্গুইন। কন্ঠের ভলিউম কখনোই স্তিমিত হতে জানে না। পাওয়া না পাওয়ার হিসাব ছাড়াই ভালোবাসা ছড়িয়ে চলে নিজের চারপাশের পৃথিবীতে।

আমি ওকে দেখতে দেখতে ভাবতে থাকি নিজের কথা। নিজের জন্য ক্রমশ করুণা জাগে। মনে হয়, আহ! এমন নিঃস্বার্থ আর ক্ষোভ ও ঘৃণাহীন মানুষ যদি হতে পারতাম! এতো সরল অঙ্কে যদি আমার সকল হিসেব মিলে যেতো! পেঙ্গুইন হওয়ার অদম্য এক আকাঙ্ক্ষা তখন আমার মনেও হয়তো চকিতে উঁকি দিয়ে যায়।

সাচ্চা মানুষ বর্তমান সময়ে বিলুপ্তপ্রায়। আমাদের পেঙ্গুইনকে আমি নির্দ্বিধায় সেই সাদা মানুষদের তালিকায় ফেলি। এইসব মানুষেরা পৃথিবীর সব মানবীয় ক্ষুদ্র ভ্রান্তির বাইরে গিয়ে মানুষকে দেখতে পায়। হয়তো সেকারণেই তাদের কাছে মানুষ অনেক বেশি মূল্যবান আর ভালোবাসার যোগ্য হয়ে উঠে।  চারপাশের সবকিছুকে এই পেঙ্গুইন মানুষেরা আশ্লেষে ভালোবাসতে পারলেও আমাদের ক্লেদাক্ত ও বিষাক্ত সময়ে তারা বড্ড বেশি বেমানান।

ফিরতি ভালোবাসা পাবে না জেনেও তারা আমাদের জন্য আনন্দ ছড়ায়। জোনাকির আলোর মতো শান্ত আন্তরিকতা আর মায়া নিয়ে তারা আমাদের কাছে এসে দাঁড়ায়। আমাদের পাশে পথ চলে। আমরা তাদের ভরসার অযোগ্য, একথা জেনেও তারা ইতস্তত টিকে থাকে এই ভেঙে পড়তে থাকা অক্সিজেনশূন্য শহরে। যে জীবন দ্বিধাহীন প্রাণবন্ততায় বেঁচে থাকার গান শোনাতে পারে, সে জীবন মানুষের নাকি পেঙ্গুইনের, তাতে কীইবা আসে যায়!


# Featured Image: Débora Denise Azevedo

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন