যে মানুষটি কখনো আমাদের ছিলো না

রোদ ইদানিং গণগনে আঁচ নিয়ে নেমে আসে। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের অধিবাসীর টাইটেল এখন আর আমাদের জন্য নয়। পিচঢালা রাস্তার বিটুমিন গলা থিকথিকে রিফ্লেকশন গরমের তীব্রতা বাড়াচ্ছে বেশ আয়োজন করে। এমন এক দুপুর সেদিন শেষের পথে। রোদে জ্বলা দুপুর গড়াচ্ছে বিকালের গাঁয়ে। রাজপথ ধরে ছুটছে পাবলিক বাস। সেকান্দার মিয়া তার পাশের সিটের মানুষটিকে দেখে কেমন চোখ কুঁচকে থাকলেন। লোকটির হাবভাব কেমুন জানি! হুদাকামে শহরে আইসা  সেকান্দার মিয়ার মেজাজ ভালো নেই। তারউপর কেমন পাগলা মার্কা লোকটা পাশে বইছে। এই কাঁঠালপঁচা রইদের মইধ্যে ভালা লাগে না সেকান্দারের।

পাগলের মতো লোকটার নাম না-মানুষ। অদ্ভূত ব্যাপার! মানুষের নাম আবার না-মানুষ হয় নাকি! লোকটির বাড়ি-ঘর নেই। পরিবার নেই। কখনো নাকি ছিলো না। না-মানুষ পাগলার সামনের সিটের ভীষণ ঝকঝকা মুখের সুন্দর মেয়েটি বারবার পেছন ফিরে না-মানুষের দিকে তাকাচ্ছে। লোকটি নির্বিকার। বাস ছুটে চলছে। রোদের ঝাঁজ কমছে। না-মানুষ কোথায় ফিরছে?

আমি অমলেশ। না-মানুষের সাথে আমার পরিচয় বহুদিনের।  একদিন এক সন্ধ্যার আগে বারান্দার গ্রীলে দাঁড়িয়ে আমি প্রথম না-মানুষকে দেখতে পাই। আমরা তখন আগ্রবাদ থাকি। বাবার চাকরীর কল্যাণে শ্যাওলাধরা বাড়ির দোতলার ছোট্ট একটি ফ্ল্যাটে আমাদের বসবাস। না-মানুষের সাথে প্রায়ই দেখা হতো। আমরা একসাথে খেলতে যেতাম। বাসার বারন্দায় বসে দুপুরের ঘুম ফাঁকি দিয়ে আকাশ দেখতাম অহেতুক। কখনো বাড়ির পেছনের ঝাড়ে বেড়ে উঠা বেশ বড়ো আকারের গাছ থেকে ঝড়ে পড়া ফুলও কুড়োতাম একসাথে। তারপর চিটাগাংয়ের পাঠ চুকিয়ে ঢাকায় ফিরলাম। তখনও আমাদের সাথে মিস্টার না-মানুষ রয়ে গেছে।

গ্রামের বাড়িতে প্রাইমারী স্কুলে কিছুদিন কাটিয়ে ঢাকায় পড়তে আসলাম। তখনও না-মানুষ আমার সাথেই আছে। একে একে এই জাদুর শহরে অসংখ্য মুহুর্ত-দিন কাটিয়ে বয়স ছাড়িয়েছে কৈশোরের কোটা। মিশেছি হাজারো মানুষের সাথে। দেখেছি অসংখ্য চেহারা। তাদের ভালো থাকা-মন্দ লাগার মোমেন্ট। তাদের ভালোবাসা-কান্নার স্মৃতি। শত সহস্র বইয়ের পাতায় ছুয়ে গেছে দৃষ্টি। অদ্ভূত হলেও সেই সেদিন পরিচিত হওয়া না-মানুষ এখনো আমার পাশেই পথ চলছে নিয়মিত।

সেদিন দুপুরে সেকান্দার মিয়া আসলেই বিরক্ত ছিলেন মিস্টার না-মানুষের উপর।  এই না -মানুষ আমার সাথে সাথে আমার ক্যাম্পাস, ক্লাসরুম, আমার বন্ধু, ক্লাসমেট সবার সাথেই পরিচিত হয়। আড্ডা দেয়। কখনো প্রেজেন্টেশনেও দাঁড়িয়ে যায়। কখনো কোন বার্গার শপে জুসি বার্গারে ম্যানার না-মানা বাইট বসিয়ে চেটেপুটে খেয়ে নেয় কোন বড়ো সাইজের বার্গার। কখনো হুদাই কষ্ট পায়, কাঁদে। মন খারাপ করে থাকে।  এইসব করে করেই মিস্টার না-মানুষ আমাদের অংশ হয়।

কিন্তু, কখনো সে আমাদের কেউ না। কারণ, তার কোন নাম হয় না। পরিচয়হীন কেউ আমাদের সমাজের অংশ হয় না কখনো। সবার সাথে থাকার পরেও সবাই একটা সময় এসে বলে, এইখানে তুমি এ্যালাউড নাহ! তোমার জন্য কোন ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, সহানুভূতি কিছুই বাকী নেই কোথাও।  তখন তাকে ফিরতে হয় নিজের না-মানুষীর পৃথিবীতে। এই সবার মাঝেও থেকেও না থাকার ভয়ংকর কষ্টটুকু মিস্টার না-মানুষের ভালোই জানা আছে।

একদিন ঘোরতর সন্ধ্যায় আমি মিস্টার না-মানুষের সাথে লম্বা আলাপে জানতে চাইলাম, তার নাম কী? জানেন ও আমাকে কী বলে? বললো, আমার নাম অমলেশ! আমি ভীষণ অবাক! বলে কি! তখন ও বললো, এই যে এই না-মানুষটাকে কেবল আপনিই দেখতে পান। আর কেউ না। ঠিক সেই মুহুর্তে আমার মনে হয়, আমি সময়ের এমন একটি প্রান্তে বা বিন্দুতে আছি, যেখানে অমলেশ আর মিস্টার না-মানুষ একই ব্যক্তির অংশ হয়ে যায়। যেখানে মিস্টার না-মানুষের জীবন যাপন করে যায় অমলেশরা।

প্রিয় পাঠক, আপনার পাশেও হয়তো আছে এমন অমলেশ কিংবা না-মানুষ। তাদের জীবনের গভীরে কখনো উঁকি দিয়ে দেখবেন। জীবন কতো সহজ আর সুন্দর হতে পারে, একাকীত্ব কতো বেশি ভয়াবহ হতে পারে, সেটা খুব সহজেই এইসব অমলেশদের দেখলেই বুঝে উঠতে পারবেন। অমলেশরা না থাকুক আমাদের পৃথিবীতে। কারণ, তারা কখনো আমাদের ছিলোই না!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন