মোয়ার সন্দেশ হাতে রহস্যময় শাজাহান কাকু ও তার হঠাৎ হারিয়ে যাওয়ার দিন

রান্নাঘরের শেলফে মুড়ির মোয়া দিয়ে বানানো চারকোনা আকৃতির বিশাল সাইজের সন্দেশের মতো কিছু একটা দেখে সেদিন আমি চমকে উঠেছিলাম। এর আগে কখনো এতো বড় মোয়া দেখার সুযোগ হয় নি আমার। মায়ের কাছে জানতে চাইলাম। মা বললেন, এটা নাকি মোয়ার সন্দেশ। আমি তখন অবাক হয়েছিলাম এটা ভেবে যে, মোয়ার আবার সন্দেশও হয় নাকি!

অদ্ভূত সন্দেশটি ভোলার কোন এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছিলেন আমার ভীষণ প্রিয় শাজাহান কাকু। তখন আমরা আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিস কোয়ার্টারে থাকি। চিটাগাংয়ে বাবার চাকরির সুবাদে এই কোয়ার্টারেই আমার শৈশবের একটা অংশ কেটেছে। বাবার সহকর্মীদের সবাইকে আমি কাকু বলে ডাকতাম। শাজাহান কাকুও তাদের একজন ছিলেন। তিনি কাজ করতেন চন্দনপুরা নামের পাশের আরেক ফায়ার স্টেশনে। বাবার সাথে কী করে তার পরিচয়, এবং কতোদিন তারা একসাথে ছিলেন আমি কখনো জানতে চাই নি। তার পদবী কী ছিলো, সেটাও আমার জানা ছিলো না। কিন্তু, তিনি ছিলেন আমার ম্যাজিক কাকু।

খুব সাদাসিদে মানুষটি লুঙ্গি আর শার্ট পড়তেন বেশিরভাগ সময়। চমৎকার দিলখোলা হাসি হাসতেন সারাক্ষণ। পান খেতেন যতোদূর মনে পড়ে। যখন আমাদের বাসায় আসতেন, সাথে করে কিছু না কিছু আনতেন। আমি উনার আসার অপেক্ষায় থাকতাম। কাকুর আনা খাবার কিংবা গিফটগুলো অন্যদের মতো হতো না। বরং, ভীষণ আলাদা রকমের হতো, মুড়ির মোয়ার সন্দেশের মতো। কখনো হাতে বানানো চিপস আনতেন। কখনো নাড়ুর পুতুল আবার কখনো কটকটির গুড় দিয়ে তৈরী গোল্লা নিয়ে আমার হাতে দিতেন। মা কখনো কখনো নিষেধ করতো কাকুকে। কিন্তু, কখনো উনি মানতেন না সেসব নিষেধ।

আমাদের গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জে। চিটাগাং শহরে রক্ত সম্পর্কের আত্মীয় বলতে কেউ ছিলো না। কিন্তু, শাজাহান কাকু আমাদের আত্মীয় ছিলেন। বাবাকে দেখতাম কোন বিপদ হলেই শাজাহান কাকুর কাছে চলে যেতেন। যখন বাসায় ফিরতেন, তখন তাকে উৎফুল্ল দেখাতো। মাকে বলতেন, শাজাহান ভাই দেখতেছে। সমস্যা ঠিক হইবো নে। চিন্তা করার কিছু নাই। শাজাহান কাকু আমাদের পরিবারকে আগলে রেখেছিলেন নিজের আপনজনের মতো করে।

কাকুর আপনজনেরা থাকতো ভোলায়। বাংলাদেশের ম্যাপ বলতে আমি তখন আগ্রাবাদ আর চন্দনপুরা ফায়ার সার্ভিসকেই বুঝি। তাই, তখন ভোলা কতোদূরে, সেটা আন্দাজ করা ক্ষমতা হতো না। কিন্তু, আমার খুব ইচ্ছা হতো শাজাহান কাকুদের বাড়িতে যেতে। উনার ছেলে-মেয়ে কতোজন ছিলো, আদৌ ছিলো কিনা, তখন এর সঠিক হিসাব মেলাতে পারি নি। তবে, এখন এতোদিন পরে এসে বুঝতে পারি, কাকু সেদিনের ছোট্ট আমার মুখে হয়তো উনার কোন আপনজকে দেখতে পেতেন। নাহলে এমন মনখুলে আমাদেরকে ভালোবাসতে যাবেনই বা কেনো!

আজকাল আমি আমার অতীতের সময়গুলোকে চোখের সামনে দেখতে পাই।  ৩৫ এমএম ফিল্মের মতো করে স্মৃতির ফিতেগুলো চলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এই চলে যাওয়ার ক্ষণগুলোতে আমি খুব করে শৈশবের শাজাহান কাকুকে খুঁজি। উনার চেহারা মনে করার চেষ্টা করি প্রাণপনে। আবছা একটা অবয়ব শূন্যে ভাসে লিটল ক্যাসপারের মতো ছায়া হয়ে। কিন্তু, কোনভাবেই সেই অবয়ব পরিষ্কার আকৃতি পায় না। ঘোলা কাঁচের ভেতর দিয়ে বৃষ্টির রাত ও শহরের রাস্তার সারি সারি আলোর মতো সবকিছু কেমন অবাস্তব হয়ে উঠতে থাকে।

সেই রাস্তায় আলোর ফুল ঝরে পড়তে থাকে থোকায় থোকায়। শাজাহান কাকুকে দেখি তিনি হেঁটে যাচ্ছেন চন্দনপুরা ফায়ার স্টেশনের দিকে। তিন/চার বছরের রনি হাঁটছে তার আঙ্গুল ধরে। এই হাঁটার শেষ কোথায় তাদের জানা নেই হয়তো।

চিটাগাং ছেড়ে আসার পর  শাজাহান কাকুকে আমি আর কখনো দেখি নি।  অবশ্য, এই জাদুর শহর আমাকে এতোটাই ব্যস্ত রেখেছিলো যে, কাকুর খোঁজও নিই নি। যখন হঠাৎ একদিন মনে হলো, আমার শৈশবের ম্যাজিক কাকুকে খুঁজে পেলে হয়তো এই নাগরিক আমার শান্তি লাগবে। তখন কাকু আমাদের সব সাধ্যের বাইরে চলে গেছেন। কাকুর ক্যান্সার ছিলো। সামর্থ্য নেই বলে কখনো চিকিৎসা করাতে চান নি। একদিন হুট করে তাই হারিয়ে গেছেন আমার পৃথিবী থেকে। কষ্ট লেগেছিলো। ঘৃণাও হয়েছিলো নিজের প্রতি। কী স্বার্থপর আমি! যে মানুষটি আমাকে নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন, তার কখনো খোঁজ নিই নি আমি!

ইদানিং একা পথ হাঁটতে গিয়ে, জীবনে থেকে হারিয়ে ফেলা প্রিয়মুখগুলোর কথা মনে করতে চেষ্টা করি। তাদের ভালোবাসার যোগ্য আমি ছিলাম না। তবুও তাদের কেউ আমাকে স্নেহ দিয়েছেন। কেউ ভালোবেসেছেন। কেউ আবার ভরসার জায়গা হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়েছিলেন আমার পাশে। তাদের আমি মনে রাখি নি। এই অকৃতজ্ঞতার বোধ আমাকে অপরাধী করে।

শাজাহান কাকুর হাসির শব্দ এখনো আমার কানে বাজে। “কাকু, আপনে কেমন আছেন?” উনার এই ডাক কখনোও থামে না। এই বিশাল শহরে জীবনের অনেকটা সময় আমি কাটিয়েছি। নতুন অনেক মানুষ এসেছে আমার এই চলার পথে। তাদের অনেকেই আমার জন্য আন্তরিকতা জমিয়ে রেখেছেন। কিন্তু, শাজাহান কাকুর স্নেহের যে অদৃশ্য চাদর আমাকে তখন শান্তিতে ডুবিয়ে রাখতো, সেরকম নিশ্চিন্ত সুখ এখন আর খুঁজে পাই না। চারপাশের ব্যস্ত ছুটে চলার মাঝে স্বল্প গতির আমাকে আজকাল বড়ো ক্লান্ত লাগে। কাকু থাকলে হয়তো বলতেন, “থাক ব্যাটা! আর দৌড়ানির দরকার নাই। একটু শান্তিতে বসো দেখি…।”

কোন এক বর্ষার দিনে আমি শাজাহান কাকুর গ্রামের বাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়াবো। উনার চিহ্নহীন কবরে বৃষ্টির টুপটাপ ঝরে পড়া দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নামবে। উনি যে ঘরে থাকতেন, সেই ঘরের আঙিনায় তার প্রিয় মানুষদের নিয়ে গল্পের আসর বসাবো। মুড়ির মোয়ার সন্দেশ আর মহিষের গাঢ় দই খাওয়ার আয়োজন থাকবে। ভোলার কোন এক অজপাড়া গায়ের সেই রাতে ঝিঁঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসবে দূর থেকে। তখন হয়তো শাজাহান কাকুর কোন উত্তরপুরুষ শোনাবে কোন নদীর গান। হারিকেনের মৃদু আলোয় আমাদের সবার চোখ মুখে প্রশান্তির ছাঁয়া নামবে। কাকু এসে হয়তো দাঁড়াবেন আমাদের বৈঠকী আড্ডায়। হয়তো সুখী সুখী চেহারা নিয়ে আমাদের জন্য প্রার্থনা করবেন।

রহস্যময় শাজাহান কাকু তখন সম্রাট শাহজাহানের শান-শওকত সাথে নিয়ে ফিরে যাবেন অসীমের সাম্রাজ্যে। চন্দনপুরা ফায়ার স্টেশনে আবার হয়তো ফিরবেন তিনি অন্য কোন নামে। তার ভালোবাসার ম্যাজিকে অন্য কোন ছোট্ট শিশুর শৈশবকে তিনি আবার রাঙিয়ে তুলবেন বর্ণীল আনন্দে..। আমি অপেক্ষায় থাকি…। প্রার্থনায় স্মরণ করি আমার ম্যাজিক কাকুকে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন