ঘুমন্ত মানুষের মুখ কখনো গল্প বলতে জানে?

মানুষের চোখ নাকি তার মনের কথা বলে! ছোটবেলা থেকেই আমরা এই লাইনটা শুনেছি নানা সময় আর পরিস্থিতিতে। কখনো শুনেছি ৯০ এর দশকের বিখ্যাত গানের লাইনে। চোখ যে মনের কথা বলে।  চোখ মনের কথা বললেও ঘুমন্ত মানুষের মুখও যে মানুষের মনের কথা বলতে পারে, এই কথাটি হয়তো আমিই প্রথম বলছি! ঘুমন্ত মানুষের মুখও কথা বলে নাকি! ফেইরি টেইলসের সেই রোজামন্ডের শত বছরের ঘুমন্ত স্লিপিং বিউটির গল্প অনেকেই হয়তো জানি। ছোট্ট রাজকণ্যার ঘুমন্ত সৌন্দর্যের মতো করে আমি ঘুমন্ত মানুষের মুখেও তাদের নিজস্ব মনের অনুভূতি কিংবা ভাবনার ছাঁপ দেখতে পাই।

শৈশবের শেষপ্রান্তে যখন আমার বয়স, তখন আমাকে আমার পরিবার ছেড়ে জাদুর শহর ঢাকাতে পাড়ি জমাতে হয়েছিলো। পড়াশোনা করে বিদ্যান হয়ে একদিন মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করবো, এমন ভাবনা থেকে। হোস্টেলে প্রথমদিন সকালে ঘুম ভেঙে যখন আমি বুঝতে পারলাম, আমার চৌহদ্দিতে পরিচিত কেউ নেই। আমি একা, তখন ভয় আর বিস্ময়ে কেঁদে উঠেছিলাম শব্দ করেই। হোস্টেল সুপারিনটেন্ডেন্ট আমাকে গম্ভীর গলায় ধমক দিলে বললেন, কাঁদতে হলে বালিশে মুখ রেখে কাঁদো। শব্দ করলে অন্যদের ঘুমের ডিস্টার্ব হবে। তখন থেকে আমার ভেতরে ্একজনের জন্ম হয়ে  গিয়েছিলো। একজন সেলফ লার্ণার ফ্রেন্ড। যে আমাকে সবসময় চারপাশ থেকে নানান কিছু শিখতে, বুঝতে সাহায্য করতো।

এই সেলফ লার্ণিয়ের একটা বড়ো মাধ্যম ছিলো পর্যবেক্ষণ। আমি খুব গভীরভাবে মানুষের দিকে তাকিয়ে দেখতাম। তাদের মুখের প্রতিটি রেখা, পেশিং সংকোচন-সম্প্রসারণ, হাসির বাঁকা কোণ, চোখের কুঁচকে যাওয়া এ্যাঙ্গেল সবকিছুই দেখতাম মনোযোগ দিয়ে। একসময় আমার কাছে এইসব কিছুর ভিন্ন ভিন্ন অর্থ দরা পড়তে শুরু করে। আমার ভেতরের লার্ণার ফ্রেন্ড আমাকে সবসময় অনুপ্রেরণা জোগাতো। আমি সাহস নিয়ে সবার চোখে চোখ রেখে কথা বলতাম। আমার মনে হতো, আমি যেনো আমার সামনের মানুষের ভাবনার গ্রাফ পড়তে পারছি।

একসময় আমার এই পর্যবেক্ষণই হয়ে উঠলো আমার সবচে  বড়ো বন্ধু। আমি ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারি মানুষ দেখে দেখে। প্রতিটি মানুষ কী ভীষণ রকম আলাদা! ঘুমন্ত মানুষের মুখ আমার সেই পর্যবেক্ষণে নতুন মাত্রা আনে। প্রতিটি ঘুমন্ত মুখ যেনো্ একেকটি টলটলে জলের স্বচ্ছ আয়না। সেই আয়নাজুড়ে মনের ভেতরকার ক্লান্তি, আনন্দ, সুখ, হতাশা, উদারতা, জটিলতা, সারল্য সবকিছুই ফুঁটে থাকে অনায়াস ব্যস্ততায়। আমার জানা নেই সেসকল রেখার চিত্র আমি বর্ণনা কীভাবে  করবো। কিন্তু, আমি বুঝতে পারি সেই আয়নার সব বার্তা।

প্রচন্ড গরমের কোন এক দুপুরে, ফার্মগেট কিংবা মৎস ভবনের সিগন্যালে আটকে পড়া লোকাল বাসে যে লোকটি আপনার পাশে বসে ঘুমাচ্ছে নিশ্চিন্তে, তাকে কখনো খেয়াল করে দেখেছেন? কিংবা আপনার খুব পরিচিত জন যখন আপনার পাশে লম্বা জার্ণির ক্লান্তিতে ঘুমে বিভোর হয়ে আছে, তাকে কখনো মনোযোগ দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন? করেন নি হয়তো। একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখতে পেতেন, অপরিচিত লোকটির মুখের ভাষা আর সেই পরিচিত মানুষটির চেহারার ভাষা ভীষণরকম আলাদা। পরিচিত জনের মুখের প্রতিটি ভাঁজে একধরণের নিরপদ বোধ করা, নিম্চিন্ত ছাঁপ আপনি দেখতে পেতেন। আর, অপরিচিত জনের মুখে বিহ্বল, দিশেহারা এবং কিছুটা অনিরাপত্তার চিহ্ন লেপটে থাকার প্রমাণ পেয়ে যেতেন।

আমি এই ভাষার ভিন্নতা বুঝার জন্য পরিচিত মানুষদের বিভিন্ন সময়কার ঘুমন্ত মুখ দেখেছি। এমন অনেকের সাতে পরিচয় আছে, যারা অপরিচিতজনদের পাশে নিয়ে বাসে কখনো ঘুমোতে পারে না। অনিরাপদ বোধ তাদের ঘুমোতে দেয় না। সেই তারাই আবার পরিচিতজনদের পাশে থাকার সময় দারুন আরামে ঘুমিয়ে পড়ে। এই যে নিরাপদ-অনিরাপদ বোধ, এই যে স্বস্তির ভিন্নতা, এই সবকিছুই ঘুমন্ত মানুষদের চোখে-মুখে আমি খুঁজে পাই।

কিছু মানুষ দেখবেন, ঘুমালে তাদের নিতান্ত শিশুর মতো মনে হয়। চেহারার সব পাপের ছাপ, নাগরিক রুক্ষতা কোথায় যেনো মিলিয়ে যায়। পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা এমন মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখবেন কখনো্। অদ্ভূত এক শান্তি আপনাকেও ছুঁয়ে যাবে। আমি জানি, আমার এই ঘুমন্ত মানুষের মুখের ভাষা অনুবাদের বর্ণনা অনেকাংশে অহেতুক আলাপ মনে হতে পারে। কিন্তু, আমি বিশ্বাস করি, মানুষ সবসময় তার চারপাশের দেয়াল তুলে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারে না। ঘুমিয়ে থাকার মুহুর্তগুলোতে সে তার সত্যিকারের চেহারার কাছে ফিরে যেতে বাধ্য। তাই, ঘুমন্ত মানুষের মুখে খুব সহজেই তাদের অন্তরালের চেহারার খোঁজ মিলে।

ঘুমন্ত শিশুদের কখনো হাসতে দেখেছেন? সেই হাসির প্রকাশ বয়স বাড়ার সাথে সাথে কমে যেতে থাকে। তেমনই শিশুদের দুঃস্বপ্নের কষ্টও শৈশবে অনায়াসে তাদের চেহারা দেখে পড়ে নেয়া গেলেও বড়ো হতে হতে হারিয়ে যায় এই আয়নার প্রতিবিম্ব। কিন্তু, আমি তেমন মনে করি না। আমার মনে হয়, সকল মানুষের ঘুমন্ত চেহারাই একেকটি স্ক্রিণ। লাইভ স্ক্রিণ। যেখানে প্রতিমুহুর্তে তার ভেতরকার সবকিছুর দৃশ্যায়ণ প্রদর্শিত হতে থাকে। সামাজিক শিক্ষা কিংবা চাতুর্য মানুষকে নিজের সত্যিকারের চেহারা, তার আসল অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে শেখায়। কিন্তু, ঘুমন্ত মানুষের চেহারায় কোনকিছুই লুকানো সম্ভব নয়। মানুষ তার সেই সময়কার স্ক্রীণের দৃশ্যের উপর কোন নিয়ন্ত্রন রাখার পদ্ধতি এখনো আবিস্কার করতে পেরেছে বলে মনে করি না্

তাই, মানুষ দেখার অন্যতম অনুসঙ্গ হিসেবে আমি ঘুমন্ত মানুষের মুখ দেখি। তাদের ঘৃণা, ভালোবাসা, নিরাপত্তার বোধ, সারল্য সবকিছুই আমার কাছে জীবন্ত পেইন্টিংস হয়ে দৃশ্যমান হতে থাকে। ঘুমন্ত মানুষের মুখ আমার সাথে কথা বলে। লম্বা বাস জার্ণিতে মিস ইউফোরিয়ার ঘুমন্ত মুখ আমাকে কোন এক নিডলস্টোনের গল্প শোনায়। যেই গল্পে শৈশবের ইউফোরিয়া তার মাকে সাথে করে কোন এক কান্ট্রিরোডের ধারে কাটিয়ে দিয়েছিলো শান্ত একটি বিকেল। কিংবা অন্য কোন গল্প। যেখানে মোরাভিয়া কিংবা সাইলেসিয়ার কোন এক ফার্মহাউজে সন্ধ্যা নামে ধীর পায়ে। আন্তোনিন দভোরাকের গানের সুরে ভেসে যাওয়া সেই রাতে ফ্রানৎজ কাফকার গল্প পড়ে যায় ইউফোরিয়ার পরবর্তী প্রজন্মের কেউ।

এইসবকিছুই আমার সামনে আলফোনৎসো মোকাঁর আঁকা পেইন্টিংয়ের মতো মনে হয়। ঘুমন্ত মানুষের মুখ তখন মুখের আদল ছাড়িয়ে যায়। হয়ে উঠে টকেটিভ কালারপ্লেট কিংবা একগুচ্ছ কথাবলা রেখার সমন্বিত কোন স্পিকার। মানুষের উপর আমার শ্রদ্ধার মাত্রা আরেকধাপ বেড়ে যায়। ক্ষুদ্র এক অস্তিত্বের ভেতর কী দারুন রকমের বিস্ময় বহন করে চলতে পারে মানুষ! ঘুমন্ত মানুষের মুখ চুপচাপ থেকেও কতোসহস্র শব্দের বার্তা ছড়ায় তার চারপাশ জুড়ে!


Feature Image: CANADA. Lambton County, Ontario. 1995. Ann TOWELL carrying Noah on the front porch. Moses is seen through the door which was made by a friend of mine from oak boards that I had salvaged from an old house that was being torn down on the St. Clair River. I brought the water buffalo skull back from Vietnam in 1990 when I travelled with a dozen U.S. war veterans who returned to rebuild a health clinic near Hanoi. The porch is covered with old worn cedar. AnnÕs hair is braided as usual.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন