জাপানি বৃদ্ধ কানশিরো যখন জোনাকী হয়ে আবার ফিরলো

জাপানি বৃদ্ধ কানশিরো যখন জোনাকী হয়ে আবার ফিরলো

অনেকদিন আগের কথা। জাপানের ওমি জেলার ফুনাকামি মুরা গ্রামে কানশিরো নামের একজন কৃষক বাস করতেন। তিনি তার এলাকাতে সততা, দানশীলতা ও ধর্মভীরুতার জন্য সবার মাঝে পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় নান কিংবা পাদ্রীদের মধ্যেও তার মতো উত্তম চরিত্রের কেউ ছিলো না। কানশিরো ছিলেন বৃদ্ধ এবং অসুস্থ। তারপরও তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবছর ধর্মপালনের উদ্দেশ্যে সফরে বের হতেন। তার অসুস্থতার কারণে গরমকালে তাকে প্রায় পেটের পীঁড়ায় ভুগতে হতো। তাই তিনি সাধারণত ঠান্ডার মৌসুমে তার ধর্মযাত্রার কাজ সম্পন্ন করতেন।

কাউয়ানসেই এর অষ্টম বছরে কানশিরোর মনে হলো, তিনি আরেকটা বছর বাঁচবেন না হয়তো। তাই তিনি আগষ্টের তীব্র গরমের মধ্যে ইশি’র মহাতীর্থে আরাধনার জন্য শেষবারের মতো যাত্রা শুরু করলেন। ফুনাকামির অধিবাসীগন কানশিরোর জন্য ১০০ ইয়েন চাদা তুলে দিলো। যাতে তিনি মহাতীর্থের ধর্মপালনকারী মহাত্মাগণের জন্য কিছু উপহার নিয়ে যেতে পারেন।

এক নির্ধারিত দিনে কানশিরো যাত্রা শুরু করলেন ইশি’র (ওমির মতো একটি জেলা) পথে।

টাকার ব্যাগ গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে কানশিরো হাঁটতে শুরু করলেন। পরবর্তী দুই দিন তিনি সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যস্ত একটানা হাঁটলেন। তৃতীয় দিনে প্রচন্ড গরমের মধ্যে ময়োজো নামে এক গ্রামে পৌঁছলেন। ক্লান্তি ও বার্ধক্যজনিত দুর্বলতায় তিনি ্প্রায় মৃতের অবস্থায় চলে গিয়েছিলেন।

কানশিরো বুঝতে পারছিলেন যে, এই অবস্থায় তিনি তার যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারবেন না। আর, তিনি অপরিচ্ছন্ন ও অস্বস্তি বোধ করছিলেন। ফুনাকামির প্রিয় অধিবাসীদের বিশ্বাস করে দেয়া পবিত্র আমানত বহনের জন্য তার নিজেকে তখন যোগ্য মনে হচ্ছিলো না। তাই তিনি প্রথমেই একটি সস্তার হোটেলে গেলেন। যেখানে ভ্রমণকারী পথিকের জন্য বিশ্রাম , আশ্রয় আর খাবারের ব্যবস্থা ছিলো। তিনি হোটেলের মালিককে তার অবস্থা এবং ১০০ ইয়েনের কথা জানালেন।

বললেন, মহাজন, আমি একজন বৃদ্ধ মানুষ। ডায়রিয়ায় ভুগছি। আপনি যদি ১ দিন অথবা ২ দিনের জন্য আমার দেখাশোনা করেন, তাহলে আমি সুস্থ হয়ে যাবো। আর, আমার সুস্থতা পর্যন্ত আপনি যদি ঈশ্বরের এই টাকাগুলো নিজের কাছে নিরাপদে রাখেন, তাহলে আমার অনেক উপকার হবে। নিজের শরীরের এই অপবিত্র অবস্থায় আমি ঈশ্বরের পবিত্র আমানত নিজের কাছে রাখতে চাইছি না। জিমপাচি, হোটেলমালিক মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানালো । এবং কানশিরোকে সবরকমে আশ্বস্ত করলো যে, তার যত্ন নেয়ার ব্যবস্থা হবে। একইসাথে  কানশিরোর ইচ্ছানুসারে ঈশ্বরের পবিত্র আমানতও নিরাপদে থাকবে।

জামপাচি বললো, ভয় নেই সৎ মানুষ। আমি আপনার টাকার থলে নিরাপদ জায়গায় রেখে দিবো। এবং আপনি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আপনার যত্ন নিবো। আপনার মতো মহৎ মানুষ এই সময়ে খুব বিরল। পরবর্তী পাঁচ দিন বৃদ্ধ কানশিরো ভীষণ অসুস্থতার মধ্যে কাটালো। কিন্তু, তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও ঈশ্বরের পথে যাত্রার অনুপ্রেরণা তাকে আবার সুস্থ করে তুললো। ষষ্ঠ দিন তিনি আবার পথে নামার ইচ্ছা করলেন।

সেদিন ছিলো একটি সুন্দর দিন। কানশিরো তার হোটেলের বিল পরিশোধ করে দিলো। হোটেল মালিককে তার মহানুভবতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানালো। মালিক ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে তার হাতে টাকার থলে তুলে দিলো। কানশিরো তখন টাকার থলে খুলে দেখার দরকার মনে করলো না। কারণ, সেখানে তখন অনেক লোকজন আর মজুররা উপস্থিত ছিলো। এতো টাকা এই অপরিচিত লোকগুলো দেখতে পাক, সেটা কানশিরো চায় নি। তাই, থলেটি গলায় না ঝুলিয়ে তার কাপড়-চোপড়, খাবারের সাথে তার ব্যাগে নিয়ে যাত্রা শুরু করলো ময়োজো থেকে ইশি’র পথে।

যাত্রার দিনে মধ্যদুপুরে কানশিরো বিশ্রামের জন্য একটি পাইন গাছের নীচে বিরতি নিলেন। খাওয়ার জন্য তিনি ঠান্ডা ভাত নিয়ে এসেছেন সাথে। তখন তিনি টাকার থলে পরীক্ষা করে দেখলেন যে, তার ১০০ ইয়েন গায়েব! সেই জায়গায় সমান ওজনের পাথর ভরে দিয়েছে কেউ। বৃদ্ধ মানুষটি টেরও পায় নি! কানশিরোর তখন ভাত খাওয়ার খুব ইচ্ছা থাকার পরেও সে না খেয়েই আবার ফিরতি পথ ধরে। যখন যে ময়োজোতে পৌঁছলো, ততোক্ষণে সন্ধ্যা নেমেছে। সে তার সাধ্যমতো জিমপাচিকে ঘটনাটা বুঝিয়ে বললো।

প্রথমে জিমপাচি করুণাসহ তার কাহিনী শুনলো। কিন্তু, যখনই কানশিরো তার টাকা ফেরৎ দেয়ার জন্য অনুরোধ করতে শুরু করলো, তখন জিমপাচি মহাখ্যাপা হয়ে গেলো। বুড়ো হাবড়া কোথাকার! একটা চমৎকার কাহিনী বানিয়ে আমাকে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করছো! এমন শিক্ষা আমি দিবো তোমাকে, যাতে কখনোই ভুলতে না পারো। তখন সে কানশিরোকে ভীষণভাবে বুকে আঘাত করলো। তারপর লাঠি দিয়ে তাকে নির্দয়ভাবে মারতে থাকলো। আশেপাশের মজুরদের দল জিমপাচির আদেশে এই মর্মান্তিক অত্যাচারে অংশ নিয়ে কানশিরোকে মৃতপ্রায় অবস্থায় ফেললো।

আহ! বৃদ্ধ কানশিরো! কী আর করতে পারতো সে? অর্ধমৃত অবস্থায় পথে নামলো। তিনদিন পর মহাতীর্থের প্রার্থনা অনুষ্ঠানে তার ধর্মীয় প্রার্থনা শেষ করে তিনি আবার ফুনাকামিতে ফিরে গেলেন। যখন ফুনাকামিতে কানশিরো এসে পৌঁছলো, তখন সে মারাত্মক অসুস্থ। নিজের কাহিনী বলতে গেলে কেউ তার কথা বিশ্বাস করতো। আবার কেউ করতো না। তারপর অনেক দুঃখে নিজের অল্প জায়গা-জমি বিক্রি করে দিয়ে তার ঋণ সবাইকে চুকিয়ে দিলো। বাকী যে অর্থ তার কাছে ছিলো, তা দিয়ে তিনি বিভিন্ন ধর্মতীর্থে, মন্দিরে তার আরাধনা চালিয়ে যেতে থাকলেন। যখন তার জমানো সম্বলটুকু শেষ হয়ে গেলো তখনও তিনি তার তীর্থযাত্রা চালিয়ে গেলেন। নিজের খাবারের জন্য তিনি ভিক্ষার সাহায্য নিতেন।

তিন বছর পর তিনি আবার ময়োজোতে যাত্রাবিরতি করলেন। তিনি তখন তীর্থযাত্রায় ইশি’র পথে ছিলাম। তিনি তখন দেখলেন, তার শত্রু তার কাছ থেকে চুরি করা টাকায় বেশ ভালো উন্নতি করেছে।

কানশিরো তখন সেই হোটেলে গেলো এবং জামপাচিকে খুঁজে পেলো। তাকে বললো, তিনবছর আগে তুমি আমার টাকা চুরি করেছিলে। অথচ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম। ফুনাকামির লোকজন আমাকে ইশি মহামন্দিরের জন্য যে টাকা দিয়েছিলো, তা ফেরত দেয়ার জন্য আমাকে আমার সহায়সম্বল বিক্রি করে দিতে হয়েছে। তখন থেকে আমি একজন ভিখারি হয়ে গেছি। তুমি মনে করো না যে, আমি প্রতিশোধ নিবো না। অবশ্যই নিবো। তুমি যুবক আর আমি বৃদ্ধ। অতি শীঘ্রই তোমার উপর প্রতিশোধের অভিশাপ নামবে।

জিমপাচি তখনও সরল চেহারা নিয়ে প্রতিবাদ করলো এবং রেগে উঠে বললো, আরে! বোকা বুড়ো! যদি একবেলা ভাত খেতে চাও বলতে পারো। কিন্তু, আমাকে ধমক দেয়ার দুঃসাহস করতে যেও না। বিপদে পড়বে।

ঠিক সেই মুহুর্তে একজন পাহারাদার তার পাহারার চক্কর শেষে ফিরছিলো। সে কানশিরোকে সত্যিকারের ভিখারি মনে করলে তাকে আটকালো। এবং তোকে টেনে হিঁচড়ে গ্রামের শেষপ্রান্তে নিয়ে গেলো। জিমপাচির প্রলোভনে পাহারাদার তাকে এই আদেশও দিলো যে, কানশিরো যেনো কখনো গ্রামে প্রবেশ না করে। চৌকিদার চলে যাওয়ার পরে সেখানেই বৃদ্ধ ও অসুস্থ কানশিরো ক্ষোভ এবং দুর্বলতায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। পাশের গ্রামের ধর্মমন্দিরের মহাত্মা যাজকগন তার লাশ উঠিয়ে নিয়ে যান। এবং. প্রার্থনা ও শ্রদ্ধার সাথে তাকে দাফন করেন।

এর মধ্যে জিমপাচি নিজের মধ্যে অনুশোচনার কন্ঠস্বর শুনতে পায়। সেই কন্ঠস্বর তার মধ্যে যন্ত্রণার অনুভূতি সৃষ্টি করছিলো। ফলে, ধীরে ধীরে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কিছুদিনের মধ্যে সে তার বিছানা ছেড়ে উঠতে অপারগ হয়ে যায়। যখন তার নড়াচড়ার সব শক্তি শেষ হয়ে গেলো, তখন একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে। কানশিরোর সমাধি/ কবর থেকে হাজার হাজার জোনাকী পোকা উড়ে উড়ে জিমপাচির ঘরে এসেজমা হতে থাকলো। ঘর ভরে উঠলো জোনাকীতে। মশারির চারপাশে শুধু জোনাকী আর জোনাকী। মশারির উপরের দিক নীচে নেমে আসছিলো জোনাকীদের ওজনে। সারাঘরের বাতাসে যতোদূর দেখা যায় কেবল জোনাকী। তাদের শীতল আলোর জ্বলা-নেভার ঝিকিমিকি জিমপাচির চোখে এসে আঘাত করছিলো। ফলে অসুস্থ জিমপাচির বিশ্রাম নেয়ার কোন অবস্থা আর ছিলো না।

গ্রামবাসীরা এসে এই অবস্থা দেখে তারা জোনাকীদের মারার চেষ্টা করলো। কিন্তু, কিছুতেই কিছু হলো না। কানশিরোর কবর থেকে জোনাকীরা বেরুতেই লাগলো। যতোগুলো জোনাকী গ্রামবাসীরা মারছিলো, তারচে দ্রুত নতুন জোনাকী এসে শূন্যস্থান পূরণ করছিলো। অবাক ব্যপার ছিলো , জোনাকীরা জিমপাচির রুম ও তার বিছানার চারপাশ ছাড়া অন্য কোথাও যাচ্ছিলো না।

গ্রামবাসীদের কেউ কেউ বলছিলো, বৃদ্ধের টাকা লোপাটের ঘটনাটা তাহলে সত্যি! নিশ্চয়ই জিমাপাচি ওই বৃদ্ধ মানুষটির টাকা চুরি করেছিলো। আর, এটি হচ্ছে সেই বৃদ্ধের আত্মার প্রতিশোধ।

তখন সবাই জোনাকীগুলোকে মারতে ভয় পেয়ে গেলো। ক্রমেই জোনাকীদের ভিড় গাঢ় থেকে গাঢ় হয়ে চললো। যখন জোনাকীগুলো মশারিতে ছোট্ট একটি ছিদ্র তৈরীতে সক্ষম হলো, তখন নেই ফাঁটল দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকী বিতরে ঢুকে জিমপাচির শরীরে বসতে লাগলো। জোনাকীগুলো জিমপাচির নাকে, মুখে, কান ও চোখের উপর হামলা করলো। যেখান দিয়ে সম্ভব হচ্ছিলো, জোনাকীরা ঢুকে যাচ্ছিলো শরীরের ভেতর। সে তীব্র যন্ত্রণায় তার পা ছুড়ছিলো আর ক্রমাগত চিৎকার করছিলো। ২০ দিন এই নরকযন্ত্রণা সহ্য করার পর জিমপাচির মৃত্যু ঘটে। তার মৃত্যুর পর সেই জোনাকীগুলো অদশ্য হয়ে গিয়েছিলো। যেনো কখনো জোনাকীর কোন অস্তিত্বই ছিলো না।

তারপর বহুকাল পেরিয়ে গেছে। তখনও ফুনাকামি আর ময়োজের মানুষ বিশ্বাস করতো যে, কারো অর্থ-সম্পদ আত্মসাত করলে কানশিরোর আত্মার শক্তিতে জন্ম নেয়া মানব-জোনাকীর দল এসে প্রতিশোধ নেবে।

# তথ্যসূত্র ও ছবি কৃতজ্ঞতা

১। স্যাকরেড টেক্সট
২। এনশিয়েন্ট টেলস এন্ড ফোকলোর অব জাপান


লেখাটি পার্থিব নামে একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছিলো। সাইটটি বন্ধ হওয়াতে লেখাটি ব্যক্তিগত ব্লগে পোস্ট করা হয়েছে। ফিচার ইমেজটি পুরনো লেখার সাথে পাবলিশ হয়েছিলো।

মন্তব্য করুন