কলম্বিয়ান কোকেইন রানী গ্রিসেলডা ব্লাংকো

১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারি। কলম্বিয়ার কার্টেজেনার এক ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরে জন্ম নেয় একজন অতি সাধারণ শিশু। কারগোডেড টিন আর কার্টনের বাক্স দিয়ে ঘেরা সেই ঘরে দারিদ্যের আশীর্বাদ ছিলো সীমাহীন। বাবা মা তার নাম রাখেন গ্রেসিল্ডা ব্লাংকো রেসত্রেপো। ব্লাংকোর মা ছিলো একজন রাগচটা ও ভয়ংকর মেজাজের মহিলা। সমাজের নিম্ন আয়ের দুঃসহ পরিবারে জন্ম নেয়ার অভিশাপ হিসেবে খুব অল্প বয়সেই অপরাধ ও পতিতাবৃত্তির জগতে ঢুকে পড়েছিলো ব্লাংকো। যুদ্ধবিধ্বস্ত কলম্বিয়ার অন্য আর ১০ টা সাধারণ পরিবারের মতো ব্লাংকোর পরিবারের দিন যাপনের কোন খতিয়ান ছিলো না। বেঁচে থাকাটাই জীবনের প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য কার্টেজেনার মানুষদের।

গ্রেসিল্ডা ব্লাংকো রেসত্রেপো
Image by WikiMedia

অভাব আর অনটনের সাথে প্রতিনিয়ত সংগ্রামের ঘনঘটায় তার কথা আলাদা করে কেউ মনে রাখে নি। কিন্তু, বহুবছর পর ব্লাংকোর কথা সবার চমকে গিয়েই মনে পড়তে থাকে। ততোদিনে সে কলম্বিয়াতে দ্যা গডমাদার নামে খ্যাত হয়ে গেছে। যদিও  শুরুর সময় ব্লাংকো তার ভরণপোষেণের তাগিদে স্মাগলিং করার কাজ করতো। কিন্তু, ১৯৫০ সালের কোন এক সময় জোসে ডোরিও ট্রুজিলো নামে একজন সুদর্শন লোকের সাথে তার পরিচয় হয়। ট্রুজিলো ছিলো ক্ষুদ্র মাপের স্মাগলার। তার সাথে নিউইয়র্কের ড্রাগ ব্যবসায়ীদের বেশ খাতির ছিলো। তখনই ব্লাংকো তার স্মাগলিং কর্মকান্ডের নতুন প্রেরণা খুঁজে পায়।  খুব বেশিদিন না যেতেই ব্লাংকো জড়িয়ে পড়ে কুখ্যাত মাফিয়া গ্যাং মেডেলিন কার্টেলের সাথে। কলম্বিয়ান ড্রাগের ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত মুখ, পাবলো এসকোবার ছিলো মেডেলিন কার্টেলের একটি অন্যতম স্তম্ভ। পাবলো ও তার কর্মকান্ডের বিস্তারিত আমরা অন্যকোন দিন অন্যকোন লেখায় তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

কলম্বিয়ান কোকেইন রানী গ্রিসেলডা ব্লাংকো
Image by Huffingtonpost

ব্লাংকোর কাজ ছিলো নিউই্য়র্ক, মিয়ামি ও সাউদার্ণ ক্যালিফোর্ণিয়ায় কোকেইনের চালান পৌঁছানোর ব্যাপারে সহায়তা করা। বলা হয়ে থাকে,  এই পাচার কাজের ঝাক্কি-ঝামেলায় তার হাতে খুন হয়েছে প্রায় ২০০ এর বেশি মানুষ। তবে, যেহেতু  সেইসব খুনের কোন লেখাজোঁকা রাখা হয় নি, তাই বলা মুশকিল যে, সত্যিকারের হত্যার পরিমাণ আসলে কেমন ছিলো। যতোদিন বেঁচে ছিলো, ততোদিনই পুলিশ আর নোরকোটিকস ডিপার্টমেন্টের নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছে ব্লাংকো।

কার্টেলের সদস্যরা ব্লাংকোর ডিজাইন করা বিশেষ পোশাকের মাধ্যমে সবচে বেশি আকারের কোকেইন পাচারে সক্ষমতা লাভ করেছিলো। ১৯৭০ সালের মাঝামাঝিতে ব্লাংকো কলম্বিয়া ছেড়ে নিউইয়র্কে চলে আসে।  এই সময়ের মধ্যেই তিনি ড্রাগ চালানকারি হিসেবে ব্যাপক খ্যাতি পেয়ে গেছেন। অথচ তখন তার বয়স মাত্র ৩০। এবং ততোদিন সে সারা আমেরিকা জুড়ে বেশ বড়ো আকারের নারকোটিকস রিং পরিচালনা করছিলো।

কিন্তু, ইউএস এর নারকোটিকস এজেন্টরা তার পেছনে ভালোভাবেই লেগে পড়েছিলো। যখন তারা জানতে পারে যে ব্লাংকো ১৫০ কিলোর কোকেইন ডেলিভারি করবে সামনের কোন একদিন। শীঘ্রই। এটি ছিলো ১৯৭৫ এর সবচে বড়ো আকারের কনসাইনমেন্ট। ব্লাংকো ও তার ৩০ জন পার্টনারকে ফেডারেল চার্জে আটকে দিয়ে জীবিত অথবা মৃত গ্রেফতারের আদেশ জারি করে কর্তৃপক্ষ। এই ইনভেস্টিগেশন অপারেশনটি সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে অপারেশন বানশী নামে পরিচিত হয়।

কলম্বিয়ান কোকেইন রানী গ্রিসেলডা ব্লাংকো
Image by Huffingtonpost

ধরা পড়ে যাওয়ার আশংকায় ব্লাংকো জরুরী ভিত্তিতে দেশ ছেড়ে পুণরায় কলম্বিয়ায় ফিরে আসে। আসার কিছুদিন পরেই আবার সে মিয়ামিতে বেশ ভালো রকমে জমিয়ে বসে।  যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময়েই ব্লাংকো কলম্বিয়ান ড্রাগ কার্টেলের ক্ষমতা ও লোকবল ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরণের অপরাধের সার্কেলে জড়িয়ে যায়।  ভাড়ায় হত্যাকান্ড ঘটানো থেকে নিয়ে আরো বহু রকমের চেহারা পায় ব্লাংকোর অপরাধের মাত্রা। যার বেশিরভাগই ছিলো ড্রাগ টাকা ও ক্ষমতার জন্য।

১৯৭৯ এর শেষের দিকে তদন্তকারীরা ডজনখানেকের বেশি খুনের সাথে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার আভাস পায়। মিয়ামির এক পানশালায় বিপক্ষ কার্টেলের  লোকদের গুলি করে মার্কেট দখলের বন্দুকযুদ্ধ বিশেষ করে তার নৃশংসতা জনগণের সামনে নিয়ে আসে। ইউএস ডিটেকটিভগণ আবার অপারেশন পরিচালনা করেন তাকে ধরার জন্য। ব্লাংকো তখনও কর্তৃপক্ষের হাত ফঁসকে বেরিয়ে আসে। তারপরের অনেকদিন সে ছিলো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ১৯৮০-র সময়কালে ব্লাংকো মিয়ামিতে তার কেনা নতুন বাড়িতে খুব আরামদায়ক পরিবেশে বসবাস করে আসছিলো।  ব্লাংকোর কুখ্যাতি তখন আকাশ ছোঁয়া। ততোদিনে তাকে ডাকা হতে থাকে গডমাদার, কুইন অব কোকেইন এবং ব্ল্যাক উইডো নামে।

১৯৮৫ তে এসে ব্লাংকোর ভাগ্যর সূতো ফুরিয়ে যায়। ক্যালিফোর্ণিয়ার আরভাইনে তদন্তকারী গোয়েন্দাদের হাতে সে ধরা পরে। ব্লাংকোর বিচারের আসর বসেছিলো নিউইয়র্কে। বলা হয় যে, সে ড্রাগ চালানের এক মামলায় সে অপরাধী। এই সুবাদে তার অন্যান্য অপরাধ, খুন ও বিভিন্ন হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার সব অপরাধ ঢাকা পড়ে যায়।  তখনকার সময়ের ড্রাগ-আইন অনুসারে সর্বোচ্চ সাজা পায় ব্লাংকো। ১৫ বছরের জেল দেয়া হয় তাকে। ১৯৯৪ সাথে ব্লাংকোকে ফেডারাল অপরাধী হিসেবে মিয়ামিতে পূণরায় পাঠানো হয়। তার উপর তখন তিনটি খুনের অভিযোগ ছিলো। যদিও ২০০ খুনের বিপরীতে মাত্র তিনটির জন্য তাকে অপরাধী হিসেবে সন্দেহ করা হয়।

কলম্বিয়ান কোকেইন রানী গ্রিসেলডা ব্লাংকো
Image by Huffingtonpost

অদ্ভূত এক ঘটনা বা পালাবদলের মধ্য দিয়ে ব্লাংকোর কেসটি বন্ধ হয়ে যায়। এই কেসের মূল সাক্ষির নাম ছিলো জর্জ রিভি আয়ালা। একসময় আয়ালা ব্লাংকোর হয়ে কাজ করতো। সে হঠাৎ করে ফ্লোরিডা আদালতের ্এটর্ণি জেনারেলের একজন সেক্রেটারির সাথে রোমান্টিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। ফলে কর্তৃপক্ষ তার সাক্ষ্যকে পক্ষপাতদুষ্টহীন হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। অনেকেই বুঝতে পারে যে আয়ালা ইচ্ছা করেই এই কেসটিকে বন্ধ করে দিতে চেষ্টা করেছে। কারণ, তার ভয় ছিলো , যদি সে সাক্ষ্য দেয় তাহলে ব্লাংকোর কার্টেলের কেউ হয়তো তাকে খুন করবে। ব্লাংকো তিন মার্ডার চার্জ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে সাজা কমানোর আবেদন করে। এবং বিচারকদের সাথে চুক্তি সাপেক্ষে তাকে ১০ বছরের শাস্তি শুনানো হয়।

২০০৪ সালের জুনে তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে কলম্বিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়। সেপ্টেম্বর ২০১২ তে ৬৯ বছর বয়সে কলম্বিয়ার মেডেলিনে খুন হয় কোকেইন কুইন, গ্রেসিল্ডা ব্লাংকো রেসত্রেপো । রিপোর্ট অনুসারে জানা যায় যে, দুইজন বন্দুকধারী মোটরসাইকেলে করে এসে একটি মাংসের দোকান থেকে বেরুবার পথে তাকে হত্যা করে। তখন সে মাত্র ১৫০ ডলার মূল্যে মাংস কিনে সাথে নিয়ে আসছিলো। শতকোটি ডলারের মালিক ব্লাংকোর জীবনের মূল্য তাহলে ১৫০ ডলার!

# তথ্য ও ছবি সহায়তা

১। লার্ণিং হিস্টোরি
২। হাফিংটন পোস্ট
৩। উইকিপিডিয়া
৪। ইউটিউব

মন্তব্য করুন