নেটিভ ইন্ডিয়ান চীফের চিঠি

সাদা মানুষের কাছে লেখা নেটিভ ইন্ডিয়ান চীফের চিঠি

চীফ সিয়াটল (সঠিক উচ্চারণে বলা যায় সেয়াথল) ছিলেন সুকুয়ামিশ বা সাসকুয়ামিশ ইন্ডিয়ানদের চীফ। সুকুয়াইমিশ ইন্ডিয়ান নৃগোষ্ঠির বসবাস ছিলো ওয়াশিংটনের দূরবর্তী উপকূল পুগেড সাউন্ডের একটি দ্বীপে। পোর্ট ম্যাডিসনের ইন্ডিয়ান রিজার্ভেশনে তাদের অবস্থান ছিলো নিজস্বভূমি থেকে উৎখাতের পর। যুবক যোদ্ধা হিসেবে চীফ সিয়াটল বিখ্যাত ছিলেন তার সাহসিকতা, দুর্ধর্ষ বৈশিষ্ট্য ও নেতৃত্বের গুণাবলীর কারণে। তিনি স্থানীয় ছয়টি ট্রাইবের উপর কর্তৃত্ব অর্জন করেন। এবং, স্থানীয় বসতীস্থাপনকারী সাদা মানুষদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখেন। যে সম্পর্ক তার বাবার আন্তরিক চেষ্টায় গড়ে উঠেছিলো।

২০১২ সালের আদমশুমারি অনুসারে প্রায় চার হাজারের মতো সুকুয়াইমিশ ইন্ডিয়ান এখানো টিকে আছে সাদা মানুষদের দেশে। সালিশান গোত্রের এক ভাষা তাদের মাতৃভাষা। যে ভাষায় সুকুয়াইমিশ অর্থ ‘স্বচ্ছ লবনাক্ত জলে বিধৌত ভূমির অধিবাসী’।

চীফ সিয়াটলের বর্তমান বিখ্যাত ভাষণ, তিনি ১৮৫৪ সালের ডিসেম্বর মাসে দিয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। যদিও তার ভাষণের বিভিন্ন সংস্করণ পাওয়া যায়। আমরা আমাদের পাঠকদের জন্য বেয়ারফুট ট্রাইবের ইন্ডিয়ান, যিনি বেয়ারফুট বব নামে পরিচিত , তার কাছ থেকে প্রাপ্ত সংস্করণটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করছি।

সুকুয়ামিশ বা সাসকুয়ামিশ ইন্ডিয়ান
Image by HistoryNet

ওয়াশিংটনের প্রেসিডেন্ট আমাদের জন্মভূমি কিনে নেয়ার বার্তা পাঠিয়েছেন। কিন্তু, আপনি কীভাবে আকাশ কিনতে পারেন? ভূমি কি কখনো বিক্রি হয়? এই আসমান ও জামিন কেনা-বেচা আমাদের আছে অপরিচিত ও অদ্ভূত ব্যপার। বাতাসে ভেসে বেড়ানো যে স্বচ্ছতার মালিক আমরা নই, পানির ফোঁটার মধ্যকার যে প্রাণের উৎসের অধিকার আমাদের নেই, কীভাবে আপনি সেসব কিনে নিতেন চাইছেন?

পৃথিবীর সকল কিছু আমার মানুষের সাথে ঈশ্বরপ্রদত্ত উপহার হিসেবে সম্পর্কিত। প্রতিটি  ঝলমলে পাইনের সূঁচালো পাতা, বালুকাময় পাহাড়, গভীর জঙ্গলে ভেসে বেড়ানো রহস্যময় কুয়াশা, প্রতিটি মিডৌ বা প্রেইরী এবং গুঞ্জনময় প্রতিটি প্রাণ। আমাদের মানুষদের অভিজ্ঞতা এবং স্মৃতিতে এই সবকিছুই পবিত্র।

বৃক্ষরাজির সুগভীর অন্দরে প্রবাহিত প্রাণের সঞ্চরণ সম্পর্কে আমরা জানি। যেমন আমরা অবহিত আমাদের শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত রক্তের সঞ্চালন সম্পর্কে। আমরা এই পৃথিবীর অংশ। আর, পৃথিবীও আমাদেরই একটি অংশ। ঘ্রাণ ছড়ানো ফুল আমাদের বোন। শক্তিশালি ভালুক, সুন্দরচোখের হরিণ আর মহান ঈগল আমাদের ভাই। সহনশীল শক্ত পালকের মুকুট, প্রেইরীর শীতল বাতাসে ভেসে বেড়ানো জলের ফোঁটা, নিত্যসহচর পনির (ছোট্ট ঘোড়া) গায়ের তাপ এবং মানুষ, এইসবকিছুই একই পরিবারের সদস্য।

যখন তুমি জেনে যাবে , তুমি কে। যখন তোমার মিশন তোমার কাছে পরিষ্কার হয়ে আসবে। যখন তুমি তোমার অন্তরের অদম্য ইচ্ছার অনলে দগ্ধ হয়ে খাঁটি হয়ে উঠবে। তখন কোন শীতলতাই তোমার হৃদয় ছুঁতে পারবে না। কোন নেশায়ই তোমাকে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না।

উজ্জ্বল পানির ধারা যা ঝর্ণা এবং নদীর মধ্য দিয়ে বয়ে চলে তা কেবল পানিই নয় বরং আমাদের মহান পূর্বপুরুষদের রক্ত। যদি আমরা আপনাকে আমাদের জন্মভূমি বিক্রি করে দিই, তাহলে আপনাকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে, এই ভূমি আমাদের জন্য ঈশ্বরকর্তৃক নির্ধারত। আমাদের লেকের প্রতিটি স্বচ্ছ পানির কণায় যে রিফ্লেকশন জ্বলে উঠে, তা আমাদের পূর্বপুরুষদের অসংখ্য স্মৃতি আর ঘটনার কথা বলে। প্রবাহিত জলের গান আমার বাবা ও তার বাবার কন্ঠে কথা বলে।

এই ভূমির মাঝে বয়ে যাওয়া নদীগুলো আমাদের ভাই। যারা আমাদের তৃষ্ণা মিটিয়ে আসছে জন্ম থেকে। যারা আমাদের নৌকা বহন করে, আমাদের শিশুদের খাবারের জোগান দেয়। সুতরাং আপনাকে নদীর প্রতি সদয় হতেই হবে যেমন আপনি আপনার ভাইয়ের প্রতি সদয় থাকেন।

যদি আমরা আপনার কাছে আমাদের জন্মভূমি বিক্রি করি, তাহলে অবশ্যই মনে করিয়ে দিচ্ছি, এইখানের বাতাস আমাদের নিকট অমূল্য। বাতাস তার আত্মার শক্তি বিলিয়ে দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে প্রাণের সকল স্পন্দন। এই বাতাস যেমন আমার পূর্বপুরুষদের প্রথম নিঃশ্বাসে বয়ে নিয়ে গিয়েছিলো জীবনের বার্তা, তেমনই সে দেখেছে তাদের শেষ শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্ষণটুকুও। এই বাতাসই আমাদের শিশুদের দিয়ে চলেছে জীবনের স্বর্গীয় নির্ঝাস। সুতরাং যদি আমরা আমাদের ভূমি বেচে দিই,তাহলে সেই ভূমিকে আমাদের জন্যই পৃথক এবং নির্ধারিত রাখতে হবে। যাতে মানুষ সেখানে গিয়ে সবুজ প্রেইরীর বনফুলের ঘ্রাণে মিষ্টি হয়ে থাকা বাতাসের স্বাদ গ্রহণ করতে পারে।

আমরা আমাদের শিশুদের যা শিক্ষা দিই, আপনিও কি আপনার শিশুদের তাই শেখাবেন? তাদের শেখাবেন কি যে, পৃথিবী আমাদের মা? পৃথিবীর কিছু হলে সেটা আসলে তার সন্তানকেই আঘাত করে?

সুকুয়ামিশ বা সাসকুয়ামিশ ইন্ডিয়ানদের ক্যানু
Image by suquamish.nsn.us

আমরা একটা বিষয়ই জানি যে, এই পৃথিবী মানুষের উপর নির্ভরশীল নয়। বরং মানুষই পৃথিবীর উপর নির্ভরশীল। সবকিছুই রক্তের মতো সম্পর্কযুক্ত যা আমাদের একত্রিত করে ধর রাখে। মানুষ কখনোই তার চারপাশের জীবনের ছড়ানোর জালকে প্রভাবিত করতে পারে না। বরং বলা যায়, সে জালের একটি অংশ হয়ে টিকে থাকে। এই জীবনের জালে সে যে ভূমিকাই পালন করুক, সেটা আসলে তার জন্যই ফিরে আসে।

একটি বিষয় আমরা জানি। আমাদের ঈশ্বরই আপনার ঈশ্বর। এই পৃথিবী ঈশ্বরের কাছে অনেক মূল্যবান। আর এই পৃথিবীকে কোনভাবে আঘাত করার অর্থ হলো তার স্রষ্টা আঘাত করা।

আপনার ভবিষ্যৎ আমাদের কাছে অজানা। কী হবে যদি সকল বাফেলো (বৃহৎ আকারের মোষ বা মহিষ) হত্যা করা হয়? বন্যঘোড়াদের খাঁচা আবদ্ধ করা হয়? কী হবে যদি বনের রহস্যময় প্রান্তগুলো অসংখ্য মানুষের গায়ের গন্ধে ভেসে যায়? কিংবা ফলফলাদির পাহাড়ের দৃশ্য কথাবলা তারের জঞ্জালে ভরে উঠে?  ঘন জঙ্গল কিংবা ঝোপঝাড় তখন কোথায় থাকবে? সব শেষ হয়ে যাবে! কোথায়ই বা যাবে মহান ঈগলের দল? সব মুছে যাবে জাদুর মতো! আদরের ঘোড়াকে চিরবিদায় জানানোর জন্য কী বলা হবে তখন? আর শিকারের কী হবে? সেটাই হবে বেঁচে থাকার শেষ আর টিকে থাকার শুরু।

যখন শেষ রেড মানুষটি শুন্য হয়ে মুছে যাবে বন্য প্রকৃতির মাঝে এবং তার স্মৃতি বিস্তৃর্ণ প্রেইরীতে ঘুড়ে বেড়ানো মেঘের ছাঁয়া হয়ে যাবে, এইসব জলাভূমি এবং সবুজের প্রান্তর , বন কি তখনো এখানে থাকবে? বাকি থাকবে কি আমাদের মানুষের , আমাদের পূর্বপুরুষদের আত্মার কোন অংশ?

আমরা এই পৃথিবীকে প্রাণের মতো ভালোবাসি। যেমন একজন নবজাতক তার মায়ের হৃৎস্পন্দনকে ভালোবাসে। সুতরাং, যদি আমরা আমাদের এই ভূমি বিক্রি করতে অপারগ হয়ে পড়ি তাহলে এই ভূমি আমাদের মতো করেই ভালোবাসবেন। যেভাবে আমরা তার যত্ন নিতাম, আপনিও সেভাবেই যত্নে রাখবেন। যখন আপনি এই ভূমির অধিকার পাবেন, তখন তার সাথে যুক্ত সকল স্মৃতিকথাকে সেভাবেই সংরক্ষণ করবেন।  এই ভূমি সকল শিশুদের জন্য সংরক্ষণ করবেন এবং ভালোবাসবেন যেমন ঈশ্বর আমাদের ভালোবাসেন। আমরা যেমন এই ভূমির অংশ তেমনই আপনি কিংবা আপনারাও এর অংশ। এই পৃথিবী যেমন আমাদের কাছে অমূল্য তেমনই তা যেনো আপনার কাছেও সমমূল্যের হয়।

আমরা জানি, পৃথিবীতে একজনই ঈশ্বর। কোন মানুষই আলাদা নয়, হোক সে ইন্ডিয়ান অথবা সাদা মানুষ। সবকিছুর পর আমরা সবাই ভাই। ঈশ্বরের সন্তান।

# তথ্য ও ছবি কৃতজ্ঞতা

১। এসেনসিউন নাউ
২। সুকুয়ামিশ ট্রাইব
৩। অনলি ট্রাইবাল
৪। উইকিপিডিয়া
৫। উইকিমিডিয়া


লেখাটি পার্থিব নামে একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছিলো। সাইটটি বন্ধ হওয়াতে লেখাটি ব্যক্তিগত ব্লগে পোস্ট করা হয়েছে। ফিচার ইমেজটি পুরনো লেখার সাথে পাবলিশ হয়েছিলো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন