আগুনের দিনগুলোতে আমার ফায়ারম্যান বাবা ও আমাদের নিজস্ব গল্প

এইগুলা আগুনের জুতা বাবা! তোমার আব্বুতো আগুন নিভায়। সেইকারণে আগুনের মধ্যে দিয়ে আব্বুকে হাঁটতে হয়। এই বড় বড় জুতা পড়লে আগুন আর ধরতে পারে না। শৈশবে আমাদের বাসায় বাবার লম্বা সাইজের গামবুট দেখে মায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলাম,  জুতাগুলো এতো বড়ো কেনো। মা তখন আমাকে জানিয়েছিলেন, এই জুতা পড়লে আর আগুন নাকি আমার বাবাকে ছুঁতে পারে না। সেই ছোট্টবেলায় রঙচটা গামবুটগুলোকে রীতিমতো চমৎকার কোন অলৌকিক পাদুকা মনে হয়েছিলো।আমরা থাকতাম তখন চিটাগাংয়ে। আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের স্টাফ কোয়ার্টারে। খুব ছোট্ট আর ছিমছাম এই কোয়ার্টারই ছিলো আমার স্মৃতির প্রথম কোন শহর! সাজানো এই কোয়ার্টারটাকেই আমি নিজের শহর বলে মনে করতাম। কারণ, তখনও শহর সম্পর্কে পরিষ্কার কোন ধারণা আমরা তৈরী হয় নি। চারপাশে বিল্ডিং। মাঝে বড়ো মাঠ। আমাদের খেলার পার্ক। পাশে একটা ছোট্ট টিলা। বিকাল হলেই আমরা ওই টিলায় চড়ার প্রতিযোগিতায় নামতাম। কোয়ার্টারের পিচ্চিদের কাছে টিলাটা ছিলো বিশেষ কিছু।

টিলায় যতোবার উঠতাম, বড়ো বড়ো সিমেন্টের ঢালাই করা অক্ষরে একটা লেখা দেখতে পেতাম। মানে বুঝে উঠা আমাদের মতো নিরক্ষরদের পক্ষে সম্ভব ছিলো না। মায়ের কাছে জানতে চাইলে তিনি একদিন খুব ঘটা করে জানালেন কী লেখা সেখানে। টিলায় লেখা ছিলো, গতি সেবা ত্যাগ। এটা নাকি ফায়ার সার্ভিসের মূলমন্ত্র! অবাক হয়ে চুপচাপ ভাব নিয়েছিলাম যে, বুঝেছি। কিন্তু, তখন আসলে কিছুই বুঝি নি। এই শব্দগুলোর সম্মিলিত অর্থ বুঝতে আমার লেগে গেছে অনেক দিন।

আগ্রাবাদের মাঠে তখন প্রতিদিন সকালে ফায়ার সার্ভিসের রোলকল হতো। মা বুঝিয়ে দিতেন যে, রোলকল মানে হচ্ছে হাজিরা ডাকা। তখন ভোরে মক্তবে আমাদেরও হাজিরা হতো। তাই সেটা বুঝেছিলাম যে, আমার কাকুরা সবাই তাদের মাস্টারের কাছে হাজিরা দিতে দাড়ান। বাবাও সেখানে নিয়মিতই যায়। আমি ভাবি, এতো বড়ো হয়ে গেছে! এখনো হাজিরা দেয়!  মাঠে নিয়মিত বিরতিতে ফায়ার রেসকিউ ড্রিল হতো। আমরা পিচ্চিরা খুব আনন্দ নিয়ে দেখতাম। একজন কাকুকে বস্তার মতো বেধে অনেক উঁচুতে উঠানো হতো। আবার তাকে নামানো হতো। তাকে অসুস্থ রোগির মতো দেখানো হতো। আবার কখনো তীব্র গতিতে হোস পাইপের পানি ছেড়ে সেই পাইপ নির্দিষ্ট স্থানে তাক করে রাখতেন কাকু রা। এমন বিভিন্ন ধরণের কসরৎ আমরা উপভোগ করতাম।

মাঠের সাথে একটা বেলি ফুলের বেশ বড়ো গাছ ছিলো। আমি আর মা প্রায় সকালে ফুল কুড়াতাম। সেই টাইমটা আমার খুব উপভোগের ছিলো। বারবার আমি মায়ের কথা বলছি। বাবা কেনো এখনো আসছে না আমার লেখায়? কিংবা গল্পে? কারণ, আমার ফায়ারম্যান বাবার সময় হতো না আমার গল্পে আসার। সেই সকালে কোয়ার্টার কাপানো সাইরেন শুনে উনি তাড়াহুড়ো করে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তেন। তখন মাত্র আমার ঘুম ভেঙেছে। আর, প্রায়দিনই ফিরতেন রাতে। ততোক্ষণে আমি শুয়ে পড়েছি। বাবার সাথে দেখা ও কথা হতো কালেভদ্রে।

কিছু কিছু ছুটির দিনে আমরা বেড়াতে যেতাম। সেই দিনগুলো ছিলো আমার জন্যে ভীষন আনন্দের। আমার খুব প্রিয় ছিলো বোম্বে সুইটসের পটেটো ক্র্যাকার্স। একদিন এরকম ছুটির দিনে আমি পটোটো ক্র্যাকার্স হাতে নিয়ে বাবার কোলে ঘুমাতে ঘুমাতে রিকশায় করে বাসায় ফিরছিলাম। হঠাৎ হাত থেকে পটোটোর প্যাকেট পড়ে গিয়ে রিকশার চাকার নিচে! আমিতো অবাক!। বাবা রিকশা সাইড করে নতুন চিপস এনে আমাকে দিয়ে বললেন, কোনকিছু অনিচ্ছাকৃত হারায়া গেলে, নষ্ট হইয়া গেলে আফসোস করতে হয় না। জানি না এখনো, বাবা তার ফেলে আসা জীবন নিয়ে কখনো আফসোস করেছেন কিনা..।

আমার বাবা ছিলেন খুব সস্তা বেতনে নিয়োগ পাওয়া একজন ফায়ারম্যান। আমরা এখন বন্ধুদের সাথে এক আড্ডার টেবিলেই হয়তো এরচে বেশি টাকা খরচ করে ফেলি। সেই ছোট্ট অঙ্কের বেতনে আমাদের পরিবারের জীবন নির্বাহ হতো। শৈশবের সময়গুলোতে আমি ধনী দরিদ্রের বৈষম্য, ক্লাস এইসব অনুষঙ্গগেুলোর সাথে তখনও খুব ভালো করে পরিচয় হয় নি। তবে, আমার এক বন্ধুর বাসায় গেলে ওর মা আমাদের সবাইকে ঠান্ডা শরবত খেতে দিতেন। আমাদের বাসায় শরবত মোটেও ঠান্ডা হতো না। গরমের দিনে কেমন যেনো তেতে থাকতো স্টিলের গ্লাসের শরীর। মা বলতেন, ওদের বাবা নাকি অনেক বড়ো চাকরি করেন। বড়ো চাকরি করলে তখন আমরাও ঠান্ডা শরবত খেতে পারবো। এই বাক্সটাকে নাকি ফ্রিজ বলে।

এভাবেই আমাদের কেটে গিয়েছে দিনের পর দিন। আমি বড়ো হয়েছি। আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিস, শাহজাহান কাকা, বারেক কাকা, খলিল কাকু, আইরিন-জেরিন, আমার প্রিয় বেলিফুল গাছ, মক্তবের অন্ধকার গভীরতার কুয়ো সব ছেড়ে আমরা ঢাকায় ফিরেছি। বাবার চাকরি এখানে ওখানে বদলি শেষে ঢাকার সদরঘাটে। আমরা গিয়ে উঠলাম গ্রামের বাড়িতে। মা বললেন, ঢাকাতে অনেক খরচতো বাবা! তোমার আব্বুর বেতনে ওখানে বাসা ভাড়া করে আমরা থাকতে পারবো না। আমি ততোদিনে বুঝে গিয়েছি যে, একজন ফায়ারম্যানের পরিবারে স্বাভাবিক হলেও নানাকিছু পাওয়ার স্বপ্ন দেখা বারণ।

তারপর আরো দিন গিয়েছে। আমি ঢাকাতে পড়াশোনা শুরু করলাম। হোস্টেলে দেয়া হলো আমাকে। ভয়ংকর খাবার আর পরিবেশের মাঝে সময় কাটতে থাকলো। সারা মাসে তখন হাত খরচের জন্য পেতাম ৫০ টাকা। আমার মনে আছে একবার হোস্টেলের সবাই টঙ্গীতে পিকনিকে যাবে, এক শিক্ষকের বাসায়। ওখানে অলিম্পিয়া মিল নামে একটা বড়ো কারখানা ছিলো। সেখানের কথা জেনে খুব ইচ্ছা করলো, আমিও যাবো। বাবাকে বললাম যে, চাঁদা ১৫০ টাকা। বাবা কার থেকে যেনো ধার করে এনে দিয়ে বললেন, বেশি টাকা লাগলে আগের মাসে জানিও।

আমার শখের জিনিস কিংবা ৫০ টাকার চেয়ে দামী কিছু কিনতে পরের মাসের অপেক্ষায় থাকতে হতো। এভাবেই আমার সুপারম্যান বাবা আমাদের সংসারটাকে টেনে নিয়ে এসেছেন। বাবাতো চাকরী করতেন। কিন্তু, উনার কারণে আমাদের  পুরো পরিবার এই ফায়ারজার্ণির সাথে ভীষণ অদ্ভূতভাবে জড়িয়ে গিয়েছিলো। আগুন আমাদের পরিবারের অনেক বড়ো ডিসিশন মেকিংয়ে গার্ডিয়ানের  ভূমিকা রাখতো।

গতবছর ( ডিসেম্বর ২০১৮) বাবা রিটায়ার্ড করেছেন। দুই যুগের বেশি চাকরির জীবনে কতো শতো ফায়ারকলে যে গিয়েছেন, নিজেও বলতে পারেন না। কোন ফায়ারম্যান মনে হয় না বলতে পারবে। কতো মানুষের বীভৎস মৃত্যু দেখেছেন, কতো মানুষের প্রাণখোলা কৃতজ্ঞতার অশ্রু দেখেছেন বাবা, তার কোন হিসেব নেই কোথাও। আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি, কতো কঠিন অবস্থায় থাকতে হয় এই ফায়ারম্যানদের। স্বল্প বেতন, অপ্রতুল যন্ত্রপাতি-রসদপত্র, অসহযোগিতাসহ আরো নানা দুর্যোগের মধ্য দিয়ে তাদের কাজ করে যেতে হয়। সবার বাঁচার আকুতির মধ্যে সবকিছুর চাপ কীভাবে সামাল দেন একজন ফায়ারম্যান, সেটাও একটা বিস্ময়!

সবাই বাইরে থেকে গালমন্দ করে, কেনো তারা আরো আগে আসতে পারলেন না, কেনো তাদের যন্ত্রপাতি নেই। কেনো পানির ট্যাংকে পানি এতো কম, আরো গাড়ি নেই কেনো…। এমন অসংখ্য অভিযোগ। কিন্তু, কখনো জানবেও না সাধারণ কেউ যে, একজন ফায়ারম্যানের জীবন কতোটা ভয়াবহ! যে মৃত্যুর ছবি, যে ধ্বংসের চিত্র আপনি দেখে শিউড়ে উঠে স্ক্রল করে চলে যাচ্ছেন, একজন ফায়ারম্যানকে সেই মৃত্যুর মাঝে দিনের পর দিন টিকে থাকতে হয়।

কখনো ভাবে কেউ যে, রাতদিন নানা ধরণের অপ্রতুলতা নিয়ে কাজ করে যাওয়া খুব সাধারণ একজন ফায়ারম্যানের একটা পরিবার আছে? জানেন, আমি কখনো বাবার সাথে বছরে ২ ঈদ করার সুযোগ পাই নি। যেকোন এক ঈদের ছুটি পেতেন বাবা। কারণ, ফায়ার সার্ভিস কখনো বন্ধ হয় না। বাবার সাথে একবার ঈদের নামায পড়ছিলাম। সাইরেন বাজলো তখনই। নামাজ ফেলে সেই ঈদের সাদা পাঞ্জাবী পড়েই ফায়ারকলে চলে যেতে দেখেছিলাম তাকে। যখন ফিরেন, তখন আর বাবার পাঞ্জাবীর আগের অবস্থা কল্পনার বাইরে ছিলো।

শৈশবের ফায়ারসার্ভিস কোয়ার্টার, আগুনের পাগলা ঘন্টি, রোলকল,  ফায়ারগাড়ির ফার্স্টকল-সেকেন্ডকল গ্রেড, থার্ডকলের ঝড়ো হুইসেল, বাবার কালিঝুলিমাখা জামা-পোশাক, সবকিছু কেমন ভাসে চোখের সামনে। গতি সেবা ত্যাগের অর্থ ততোদিনে আমার ভালো করেই জানা হয়ে গেছে। আগুন, দূর্ঘটনার নানা স্মৃতি বাবাকে দিনে দিনে ক্রমশ নির্বিকার করে দিয়েছিলো। বাবা এখন খুব কম কথা বলেন। আমার সাথে বাবার ছোট্টবেলার নৈকট্য এখন বহুদূরের বিষয়। আগুনের দিনগুলো আমাদের মধ্যে তৈরী করে দিয়েছিলো সুদীর্ঘ দূরত্ব। বাবা আমাদের পরিবারের চেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছেন ফায়ারকলে!

লেখার শুরুতে বলা সেই গামবুট পায়ে আগুনে চলাফেরা করা যায় সত্যিই। কিন্তু, তখনকার বুটগুলোতে ভেতরে পানি দেয়া থাকতে অল্প করে। বারবার পানি পাল্টে সেই বুট পড়ে বাবা আগুনের হাঁটতেন। এক অপারেশনে বাবার ফায়ারবুটের ভেতরে থাকা পানি অতিরিক্ত গরম হয়ে গিয়েছিলো। সময়মতো ভেতরের পানি পাল্টাতে পারেন নি। পায়ে ফোস্কা পড়ে জুতা আটকে গিয়েছিলো পায়ের সাথে। বুট কেটে বের করতে হয়েছিলো পা।

এইরকম অদ্ভূত একটা জীবন আমরা কাটিয়েছি। আগুনের দিনগুলোতে আমার ফায়ারম্যান বাবা প্রাণপন চেষ্টায় লড়ে গেছেন। কিন্তু, এতোবছর পরে এই রিটায়ার্ড সময়ে এসে উনাকে এখন ভীষণ ক্লান্ত লাগে। আমি জানি, এই বিশাল লেখা পড়ার ধৈর্য সহজে হয় না। তবুও যদি এই অংশ আপনার নজরে পড়ে, তাহলে বলছি, একজন ফায়ারম্যান সত্যিকার অর্থেই সুপারম্যান। অন্তত এই দেশে।

উনারা কখনো হয়তো ইকারাসের মতো ডানায় চড়তে পারেন না। কিংবা ফিনিক্স পাখির মতো আবার সুন্দর সাজানো জীবনে পূণর্জন্ম নিতে জানেন না। কিন্তু, আগুনের ডানায় চড়ে এই ফায়ারম্যানরাই আমাদের অসংখ্য জীবনকে নতুন করে বাঁচার সুযোগ দেন। আপনি বলতেই পারেন, এটা তার চাকরি। কিন্তু, কখনো কোন ফায়ারম্যানকে জিজ্ঞাসা করলেই বুঝতে পারবেন যে, চাকরির চেয়েও অন্য বহুকিছু এখানে রয়েছে।

আগুনের দিন কখনোই না ফিরুক। এইসব ক্ষণজন্মা আগুন-মানুষদের জন্য অহর্ণীশ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জমিয়ে রাখি। কখনো হয়তো এই মানুষগুলো ইকারাস হবেন। সেদিন আর কোথাও জ্বলবে কোন আগুনের ফুলকি। পুড়ে ছাই হবে না কোন মানুষ। অসংখ্য পোড়া গল্পগুলো থেকে ফিনিক্স পাখির মতো সেদিন জন্ম নেবে আবার কোন নতুন গল্প।

 


# Featured Image Courtesy: GETTY IMAGES

মন্তব্য করুন